২০০৬ সালের এক হৈমন্তী বিকেলে জন্ম নেয় ' ইনোভেটর'। বইপড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্লাটফর্ম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আশ্রয়ী বই। কী তমসাচ্ছন্ন, কী বিষাদ-বিপন্নতায় ভরা দুই হাজার ছয়ের বাংলাদেশ! সেই থেকে বই বই করে বেড়ানো। 'একাত্তরের দিনগুলি' থেকে 'অসমাপ্ত আত্নজীবনী'। শত থেকে সহস্র ছেলে মেয়ের উচ্ছ্বাস জড়ানো বইপড়া এখন এক আলোক অভিসারী উৎসব এর নাম।
যুগটা ডিজিটালের। দেখা-অদেখা, বিশ্বাস - অবিশ্বাসের দোদুল্যমানতায় কাটে প্রতিক্ষণ। মুঠোয় পুরে রাখা বিশ্ব। সব কিছু ছাপিয়ে বইয়ের আবেদন কখনো হারিয়ে যায়নি, হারিয়ে যায়ও না।
মুক্তিযুদ্ধের বইগুলোকে আমি বলি 'আমার বুকের পাঁজর'। এই সুন্দর দেশটাকে ভালোবাসতে হলে এর জন্ম-ইতিহাস পাঠ ছাড়া কোনো উপায় নেই। 'ইনোভেটর' জন্ম থেকে সেই কাজটাই করার চেষ্টা করছে। হয়তো কিছুটা পেরেছে, হয়তো কিছুই পারেনি। কোনো আফসোস নেই। এ পর্যন্ত তেরোটি আসরে অংশ নিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী। তারা পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বইগুলো।
তারুণ্যকে বইমুখী, মুক্তিযুদ্ধমুখী করার প্রয়াসেই সকল কর্মযজ্ঞ আমাদের। এই যে চমৎকার একটি জীবন আমরা কাটাচ্ছি, এতো রূপ, এতো ঐশ্বর্য, এতো বৈভব ছড়ানো জীবন আমাদের - সে জীবনকে বই ছাড়া আর কীভাবে জানা সম্ভব! ইনোভেটর বলে বেড়ায়, ইনোভেটর করে দেখানোর চেষ্টা করে - বই-ই সুন্দর। আমরা বলি, মায়ের মতোন এই দেশটার জন্য এতো যে মায়া,এতো যে আকুলি বিকুলি সময়ে অসময়ে, সেই দেশটার ভেতরকে, ভেতরের অনিন্দ্য সুন্দর রূপকে দেখতে হলে বই পড়তে হয়। যারা এই দেশটাকে আমাদের দিয়ে গেলেন তাদের প্রণতি জানাতে, তাদের রক্তের ঋন শোধ করতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুশীলন করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করতে না পারলে, বাঙাল জনম ব্যর্থ হবে। লক্ষ শহীদের আত্নদান মনে না রাখলে স্বার্থপরতার কলংক বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের। তখন এই দেশ, এই দেশের জল-মাটি আমাদের ক্ষমা করবে না।
প্রায়শই বলি, আমার বুকের ভেতর বড়ো একটা স্থান নিয়ে বসে আছে 'ইনোভেটর' আর বইপড়া উৎসব। আমার ভাবনার আকাশে খুব করে বলার মতোন কোনো তারার গল্প নেই; যা আছে তার মধ্যে বইপড়া সবচেয়ে বেশী জায়গা নিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় বইপড়ার কথা ছাড়া অন্য কিছু বলতে গেলেও বোধয় ঠিকঠাক বলতে পারবো না।
ইনোভেটর এর জন্য সবচেয়ে সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, জেলা পরিষদ, সিলেট কে সাথে নিয়ে এবার জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অমর গ্রন্থ ' অসমাপ্ত আত্মজীবনী' পাঠের আয়োজন। সিলেট জেলার ৮৮ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৬ জন শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধুকে জানার মহোৎসবে অংশ নিয়েছে। জাতির পিতার প্রতি আনত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ব্যঞ্জনায় গত ২১ ডিসেম্বর, সিলেট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল মুজিবেরই প্রিয় এক খন্ড লাল সবুজের ময়দানে। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য! আহা, সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে শত শত শিক্ষার্থী লাইন ধরে 'অসমাপ্ত আত্নজীবনী' গ্রহণ করছে, এর চেয়ে সুন্দরতম, পবিত্রতম দৃশ্য আর কী হতে পারে!মনের গহীনে তখন আনন্দসুর বেজে ওঠে। প্রায় এক যুগের বেশি সময় আগে দেখা আমি আর রেজওয়ান ভাইয়ের একটি স্বপ্ন-বইপড়া একদিন উৎসবে রূপান্তরিত হবে! এখন একেকটা ডিসেম্বর আসলে, একেকটা ফেব্রুয়ারি আসলে, একেকটা মার্চ আসলে আমরা শিহরিত হয়ে উঠি কেবল। একটি বইয়ের জন্য এতো উচ্ছ্বাস, এতো আবেগ! নতুন কাপড় কেনা, গাড়ি রিজার্ভ করে দল বেধে আসা, পরীক্ষার জন্য আগের রাতে হোষ্টেলে রাত যাপন... শুধু বইয়ের জন্য, বইপড়া উৎসবের জন্য।
যারা কারণে, অকারণে তারুণ্যের দোষারোপ করেন, আমি আমার দেখা থেকে বলি, এদেশের কিশোর - তারুণ্যকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারলে এরা কখনো বিপথে যাবে না। বইপড়া উৎসব আমাকে এই আশ্বাস দিয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, মুক্তিযুদ্ধের বইপড়ুয়ারা কখনো দেশবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হবে না। এ-ই অর্জন আমাদের! আর তো কোনো চাওয়া নেই... এই নতুন প্রত্যয়দীপ্ত সূর্যোদয়ের অপেক্ষাতেই আমরা, জ্ঞানের আলোয় যেদিন অবাক হবে সূর্যোদয়।
আবারও বলি, বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব হলে জীবন অন্যরকম আহ্লাদিত হয়। বালিশের পাশে প্রিয় বইটা থাকলে রাতের পৃথিবীতে নিজেকে রাজা-রানী মনে হয়। একটা বই হাতে থাকলে, একটা বইয়ের গল্প মগজেই নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারলে আপনার চেয়ে আনন্দময় জীবন আর কারো হবে না। বাড়িতে বুক শেলফে হাত বুলালে দেখবেন, মনে হবে - এ হাত স্বর্গের ছোঁয়া পেয়েছে। বলুন তো, বই ছাড়া সংশয়হীন এমন প্রেমানুভব আর কোথায় মেলে?
বইপড়া আর পড়ানোর কাজটা আমার ছোট্ট জীবনের অনেক বড়ো আনন্দের একটি কাজ। তবু কোনো আনন্দই অনায়াসে কাছে আসে না। কোনো কাজই কন্টকহীন হয় না। কোনো পথই শুধু ফুলে ফুলে বিছানো থাকে না। আকাশে মেঘ থাকে, তাঁরাও থাকে। মুক্তো ফলানো ওতো সহজ না।