মাধব রায়
গল্পকার-প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
বঙ্গবন্ধুর ডাকে ত্রিশলক্ষ আত্মবলিদানকারী সাহসী বীরদের একজন হলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ থানার আগরপুর ইউনিয়নের রহিমগঞ্জ গ্রামে মহিউদ্দিন এর জন্ম। পিতা মোতালেব হাওলাদার এবং পিতামহ আব্দুর রহিম হাওলাদার। জাহাঙ্গীর এর মাতা সাফিয়া বেগম গৃহিণী ছিলেন।
জাহাঙ্গীররা তিন ভাই, তিন বোন। ১৯৪৯ সালের ৮ মার্চ (মতান্তরে ৭ মার্চ) মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এর জন্ম হয়। পিতা একজন বাউলশিল্পী হওয়ায় সাংসারিক কাজকর্মেও তেমন মন ছিল না। জাহাঙ্গীর এর লেখাপড়া বা তাঁর মানুষ হবার বিষয়েও পিতার ছিল গা ছাড়া ভাব। এই বিষয়টি লক্ষ্য করে জাহাঙ্গীর এর বড় মামা-মামি এগিয়ে এলেন ছোট্ট শিশুকে মানুষ করতে। ১৯৫৩ সালে সাড়ে তিন বছর বয়সেই মামার বাড়ি মুলাদী উপজেলার পাতারচর গ্রামে পাতারচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন মহিউদ্দিন। বড়মামা-মামি তাঁর লেখাপড়ার দেখভালও করতে থাকেন। জাহাঙ্গীর অংকে পারদর্শিতা লাভ করেন মামা-মামির হাত ধরেই। ফলে এই বালকটি সারা স্কুলে সবচেয়ে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিতি পায়। মুলাদী মাহমুদজান পাইলট হাইস্কুলে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ক্লাস সিক্সে এসে ভর্তি হলেন। তিনি দুইবার সেই স্কুল থেকে বৃত্তি লাভ করেন। সেই স্কুল থেকেই সাফল্যের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) পাশ করেন।
মুলাদীতে তেমন ভালো কলেজ না থাকায় এরপর তিনি বরিশাল শহরে তাঁর মেজমামার বাড়িতে থেকে ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সেখান থেকেই আইএসসি পাশ করেন।
এইচএসসি পাশ করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হলেন। তখন আবার তাঁর বড়মামা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। চাকরিজনিত কারণে বড়মামা থাকতেন ফার্মগেটে। জাহাঙ্গীর ফার্মগেট থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করেন। একদিন তিনি দেখলেন সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। আবেদন করলেন এবং তাঁর স্বপ্ন সফল হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৫তম শর্টসার্ভিস কোরের প্রশিক্ষণার্থী ক্যাডেট অফিসার হিসেবে মনোনীত হলেন তিনি। ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ না করেই তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি ‘কাকুল’এর উদ্দেশে রওয়ানা হন। সেনাবাহিনীতে তাঁর নম্বর ছিল পিএসএস-১০৪৩৯। দীর্ঘ আট মাসের প্রশিক্ষণের মধ্যে চার মাস শীতকাল এবং তখন বৃষ্টির মতো বরফ পড়ে। বরফের মধ্যেই চলে কঠিন প্রশিক্ষণ। ২ জুন ১৯৬৮ তিনি সোনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট পদে কমিশনপ্রাপ্ত হন। এরপর দীর্ঘ এক মাসের ছুটি মেলে। ছুটিতে বাড়ি এসে তাঁর যেন আর সয় না। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ কী চমত্কার টিপটপ অবস্থায় আছে। সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া, আধুনিক সব অট্টালিকা, শিক্ষা-দীক্ষা, প্রযুক্তিগত দিক, যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছুতে উন্নত হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান। আর আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের করুণ অবস্থা। সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে বাংলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা (যদিও অসমাপ্ত) ছাত্র মহিউদ্দিনকে এই বিষয়গুলো খুব পীড়া দিতে থাকে। এর মধ্যে তাঁর এক মাসের ছুটি শেষ হয়ে গেল। তিনি বৈষম্যের গ্লানি-ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গেলেন।
১৯৬৮ সালের ৩ ডিসেম্বরে তাঁকে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। আরও উন্নত প্রশিক্ষণের পর ১৯৭০ এর ৩০ আগস্ট তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। কিন্তু তাঁর এই পদোন্নতিতে তিনি খুশি নন। তিনি দেখেছেন বাঙালিকে পাকিস্তানিরা কীভাবে দাবিয়ে রাখতে চায়। সামরিক বাহিনীর ব্যারাকেও অন্যান্য পশ্চিমা সহকর্মীরা বাঙালি সৈনিকদের অবহেলার চোখে দেখত।
এদিকে তাঁর মতো সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বৈষম্যের ক্ষোভে ফুঁসছে (রাজাকার-আলবদর-আলশামস ছাড়া অন্যরা)। বাঙালির নেতা শেখ মুজিব তাঁদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে পথ দেখাচ্ছেন। তিনি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ ১৯৭১ আঙ্গুল উঁচিয়ে এক ভাষণ দিয়ে দিলেন। জানিয়ে দিলেন-আর নয়, এবারে আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে তোমাদের মোকাবেলা করব।
এর মধ্যে ২৫ মার্চ কালো রাত্রে পিশাচের দল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলে পড়ে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য স্থানে পৈশাচিক কায়দায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। একরাতে তারা এক লাখ নিরস্ত্র মানুষকে মেরে ফেলে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের অনেকে শহিদ হন এবং বাকিরা বীরদর্পে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী শুধুমাত্র ২৫ মার্চ একরাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক ভয়াবহতম ঘটনা।
পরের অংশ আগামীকাল