ইসলামে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে উত্সাহিত করা হয়েছে এবং নারী জাতির মেধা, মনশীলতা, বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্কর্ষের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদানের সাথে সাথে নারী শিক্ষায় ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতাও দিয়েছেন। কেননা তিনি মনে করতেন, নারীকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে যেমন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয় তেমনি শিক্ষিত জাতি গঠনে এবং পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার জন্য মেয়েদের শিক্ষা কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করা অনস্বীকার্য। যেমনভাবে উম্মুল মুমিনীন তাঁদের কাছে আগত মহিলাদেরকে ধর্মীয়, ব্যক্তিগত, পারিবারিক প্রভৃতি বিষয়ে নৈতিক শিক্ষাদান করতেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলো, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান?’ (সূরা আল-যুমার, আয়াত : ৯) তাই নবী করিম (স) স্বয়ং নারীদের বিদ্যাশিক্ষা গ্রহণের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে নারীদের উদ্দেশে শিক্ষামূলক ভাষণ দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ।’ (ইবনে মাজা)
ইসলাম নারীকে মৌলিক মানবাধিকার তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পুরুষের সমান মর্যাদা প্রদান করেছে। ইসলাম নারীকে বিদ্যাশিক্ষার অধিকার দিয়েছে। ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনের শিক্ষা-দীক্ষা এবং যাবতীয় দায়-দায়িত্বের সাথে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ নারীর রয়েছে। ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে আরবে মাত্র ১৭ জন লোক পড়ালেখা জানতো, এর মধ্যে ৫ জনই ছিল নারী। তাই নারীর ব্যক্তিসত্তার পরিচর্যা, আত্মিক উন্নয়ন ও নৈতিক গুণাবলির উত্কর্ষ সাধনের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও জ্ঞানার্জনের পরামর্শ দিতেন। মুসলিম পরিবারে কন্যাশিশুর শিক্ষা-দীক্ষা, ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় দায়ভার পিতাকে গ্রহণ করতে হয় স্বেচ্ছায় সুসম্মতিতে তার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত। এজন্য কন্যাশিশু প্রতিপালন ও মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষাদানের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে নবী করিম (স) ফরমান, ‘যার দুটি বা তিনটি কন্যা সন্তান আছে এবং তাদের উত্তম শিক্ষায় সুশিক্ষিত ও প্রতিপালিত করে সত্ পাত্রস্থ করবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে সহঅবস্থান করবে।’ (মুসলিম)
নবী করিম (স) নারীদেরকে সৃজনশীল চিন্তা-চেতনায় ও শিক্ষা-গবেষণায় সুদক্ষ করার জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করেন। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন শুধু নারীদের শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। রাসূলুুল্লাহ (স)-এর কাছে নারীরা এই মর্মে অভিযোগ করলেন যে, আপনার কাছে শিক্ষার্জনের ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে পুরুষরা এগিয়ে। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বরাদ্দ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন এবং নির্দিষ্ট দিনে তাদের সাথে সাক্ষাত্ করে দিক-নির্দেশনামূলক জ্ঞান, শিক্ষা ও উপদেশ দিতেন। (বুখারী)
মহানবী (স)-এর সহধর্মিণী হজরত আয়েশা (রা) সহ অনেকেই নারী শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁকে হাদিস বর্ণনাকারী ইমাম ও অধিক জ্ঞানসম্পন্ন সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয়। বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেন এবং ইলমে দ্বীন শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বর্ণিত ২২১০টি হাদিসের মধ্যে ১৭৪টি বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে। মুসলিম রমণীদের মাঝে তিনি ছিলেন প্রথম শিক্ষিকা, সর্বোচ্চ মুফতি, সবচেয়ে জ্ঞানবতী ও বিচক্ষণা। সেই যুগে জ্ঞানের জগতে তাঁর ছিল অসাধারণ ভূমিকা। আরবদের ইতিহাস, চিকিত্সাবিদ্যা ও পদ্য সাহিত্যে তিনি ছিলেন অধিকতর জ্ঞানী, সঠিক সিদ্ধান্ত ও দৃঢ় যুক্তি উপস্থাপিকা, জাগতিক জ্ঞানে অধিক পারদর্শী আর দ্বীনের বিষয়ে অধিক বোধসম্পন্না। তিনি ধর্ম, দর্শন বিষয়ক বিভিন্ন মাসআলার উদ্ভাবক ছিলেন। তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন। পবিত্র কোরআনের তাফসির, হাদিস, আরবি সাহিত্য ও নসবনামা সম্পর্কে পূর্ণ পাণ্ডিত্য এবং বাগ্মিতায়ও তাঁর সুখ্যাতি ছিল।
জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে নবী করিম (স)-এর আদরের দুহিতা খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমা (রা) ছিলেন অনন্যা। তিনি পিতার কাছ থেকে দ্বীনের শিক্ষা অর্জন করে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। মদিনায় তাঁর গৃহে প্রায়ই বিভিন্ন জ্ঞানপিপাসু মহিলার ভিড় লেগে থাকত। তখন তাঁর ঘর ছিল একটি শিক্ষাকেন্দ্র। অতএব, মেধাবী নারীদের কোণঠাসা করে না রেখে, তাদের শালীনভাবে নিরাপদে চলাফেরা ও উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষায় সুযোগ করে দিতে হবে; এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। দেশের নারীরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলে তাদের সন্তান-সন্ততিরাও সঠিক শিক্ষা পাবে। তাদের উপযোগী ও পৃথক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশও আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
lলেখক: প্রফেসর ও এডভাইজার, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, স্কুল অব লিবারেল আর্টস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, উত্তরা, ঢাকা