সবাই যেন শুধু বলতে চায়, শুনতে চায় না; ডেল কার্নেগীর সেই উক্তি ‘Be a good listener’, অনেকে অনুধাবন করে না। ‘যিনি বলেন, তিনি শুধু জানা বিষয়কেই বারবার বলেন, কিন্তু তিনি যদি বেশি শুনতেন, তাহলে নতুন কিছু জানতেন’ (ফেসবুক)। আবার অনেক ক্ষেত্রে যিনি যে বিষয়ে অভিজ্ঞ তিনি সে বিষয়ে কথা বলেন না; যার সাহিত্যের ওপর পাণ্ডিত্য তিনি বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলেন, যিনি ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ, তিনি অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, তারা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তবে রাজনীতি নিয়ে সকলেই আলোচনা করেন, কারণ তারা সকলেই ভোটার, তাদের মধ্যে অনেকেই নেতা আবার কেউ কেউ আইনপ্রণেতা। এর বাইরেও রয়েছে নানা পেশার জনপ্রিয় মুখ, যারা ব্যক্তিগত জীবন ও নিজ পেশার পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্রসহ সব বিষয় নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
আলোচনার বিষয়বস্তুর কোনো অভাব নেই। কমতি নেই পক্ষে-বিপক্ষে বলার, কিংবা যুক্তিতর্ক উপাত্তের। কখনো রাজনীতি অথবা অর্থনীতি’ আবার সমাজব্যবস্থা কিংবা শিক্ষা, এইভাবে বিজ্ঞান, ধর্ম, অপরাধ, আইন, শাসনব্যবস্থা, আধুনিকতা এবং প্রতিনিয়ত ঘটে চলা ঘটনা-দুর্ঘটনাসহ নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা মাঠে কিংবা মিডিয়ায়, বক্তৃতার মঞ্চ কিংবা টকশো, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা কথা বলেন, আলোচনা করেন, বিশ্লেষণ করেন, জনসাধারণ-শ্রোতা-দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন কিংবা বুঝিয়ে থাকেন। তবে তাদের সব কথাই যে ধর্তব্য কিংবা অনুসরণীয় তা কিন্তু বিবেচ্য। সমাজে জনপ্রিয় কিন্তু দুর্নীতিপরায়ণ, তার চটুল কথা শুনলেও কেউ সহজে বিশ্বাস করে না। যিনি চরিত্রহীন তার কাছে কেউ সত্ চরিত্রের বুলি শুনবে না। দুর্নীতি করে হঠাত্ বড় লোক, বড় নেতা, সমমনা ছাড়া কে শুনবে তার কথা। সুকৌশলে কুকর্ম করে ও সমাজে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো লোককে চিনতে পারে না, এমন কি হয়? যার জীবনে সংসার, ধর্ম নেই তার কাছে কেউ সংসার ধর্ম শিখবে না। আবার কখনো দলাদলি, তাদের মধ্যকার তর্কবিতর্ক একে অপরের দুর্বলতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে, যা থেকে কেউ সাময়িক লাভবান হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের কলঙ্কিত করে। কোনো কোনো বক্তার বক্তৃতায় অশ্লীল শব্দের সমাহার, হুমকি-ধমকি, বাস্তবে তারা ভিন্ন মতের কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে, পরক্ষণেই আবার জনসমক্ষে কিংবা টিভি পর্দায় এসে নীতিবাক্য বলে, ভালো মানুষ সাজে, এ যেন বহুরূপী। অতি আধুনিকতায় অভ্যস্ত কেউ কেউ তার জনপ্রিয়তার আড়ালে নিজস্ব ঐতিহ্য, সামাজিক-ধর্মীয় রীতিনীতিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রেখে পাশ্চাত্যের পথ দেখায়। অনিয়ন্ত্রিত আধুনিকতা যদি অশ্লীলতায় পৌঁছায়, সেই আধুনিকতা নিয়ন্ত্রণও প্রয়োজন হয়। কেউ কেউ নিজ জনপ্রিয়তার শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের ভুল, ব্যর্থতা ও সমালোচনাকে দর্শক-শ্রোতাদের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন এটি সমাজে স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু তা যে নীরবে সমাজের অন্যদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তার খেয়াল কি রাখেন? ফেসবুক, ইউটিউবে পাবলিক মন্তব্য পড়েও একজন বুঝতে পারেন কেমন বক্তা তিনি, কতটুকু তার গ্রহণযোগ্যতা, তাকে প্রতিপক্ষরা হয়তো সমালোচনা করতে পারে, কিন্তু অন্যদের নেতিবাচক মন্তব্য যদি বুঝেও না বুঝেন তাহলে তিনি দর্শক-শ্রোতার কাছে নিন্দিত, হাসির পাত্র কিংবা সমালোচিত।
তবে সাধারণ মানুষ যখন যার কথা শুনে, তাদের কাছে তার কথাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। আবার কাকে গ্রহণ করবে, তা নিয়েও ধাঁধায় পড়ে। যারা বক্তা, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তাদের নীতি-আদর্শ, নৈতিকতা, শিক্ষা, আচার-আচরণ, ব্যবহার, বাচন ভঙ্গি, চাল-চলন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন ধারণের উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে। যাদের কথা শুনে গ্রহণ করা যায়, তাদের ক্লিন ইমেজ থাকতে হয়। যারা জ্ঞানবিলি করেন তারা ব্যক্তিত্ব বান হবেন, এটাই সকলের নিকট প্রত্যাশিত। আর যারা এইগুণে গুণান্বিত নয়, তারা পরিচিতি পেলেও গ্রহণযোগ্যতা নেই।
এতসব বিভ্রান্তির মধ্যে অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, যেমন; যিনি বলছেন, সমাজে কি তার গ্রহণযোগ্যতা আছে? তিনি কি সত্ এবং সত্ চরিত্রের অধিকারী? দল-মত-নির্বিশেষে তার নিরপেক্ষতা কতটুকু? বিশিষ্ট ব্যক্তির ভিত্তি কি শিক্ষা, অথর্, নাকি দাপট? শিক্ষাগত অবস্থান কী? সামাজিক মূল্যবোধের মাপকাঠিতে তার অবস্থান কোথায়? তার মধ্যে কি কথা ও কাজের মিল পাওয়া যায়? তিনি যেটা নন তার ওপরেই কি কথা বলেন? তার কথা কি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনা যায়? তিনি কি নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতেই বেশি বিশ্বাসী? তিনি কি উসকানিমূলক বক্তব্য দেন? তিনি কি শৃঙ্খলাবোধ সম্পন্ন ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল? খোলামেলা উচ্ছৃঙ্খল জীবনে কি তিনি অভ্যস্ত? তার ব্যবহারে, কর্মে মানুষ কি অনুপ্রাণিত হয়? জ্যেষ্ঠদের প্রতি কি তিনি শ্রদ্ধা-সম্মানও সৌজন্যতা প্রদর্শন করেন? সত্যিকার অর্থেই তিনি কি নিজ অবস্থান থেকে মানুষের উপকারে আসেন, না কি শুধু স্বার্থের জন্য কথা বলেন, আর ক্যামেরা বন্দি হন? ইত্যাদি।
তবে এভাবে খুঁজতে যেয়ে যদি নিজের পছন্দের তালিকায় খুব বেশি কাউকে পাওয়া না যায়, তাহলে করণীয় কি? বিনোদনের জন্য সত্য-মিথ্যার যুক্তিগুলো উপভোগ করা, যুক্তি শুনে রাগ হলে, মেজাজ তিরিক্ষি হলে, রক্তচাপ না বাড়িয়ে টিভি চ্যানেল পরিবর্তন করা, বাইরের অনুষ্ঠান হলে মোবাইলে চোখ রাখা, তা না হলে বসে বসে সৃজনশীল কাজের কথা ভাবা। কেউ যদি এইসবও করতে না চায়, তাহলে এগুলো এড়িয়ে চলা, সৃজনশীল কাজে সময় ব্যয় করা, বই পড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করা, পরিবারকে আরো বেশি সময় দেওয়া, অসুস্থ কিংবা বিপদগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসা, আত্মীয়স্বজন, ভাইবোনদের খোঁজ নেওয়া, মোবাইল রেখে ঘরোয়া টেবিল আড্ডায় বসা। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ যাকে পছন্দ, তাকেই অনুসরণ করা। যদিও সমাজে উদাহরণ সৃষ্টিকারী আদর্শবান মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে, অনুসরণ করার মতো লোকের সংখ্যাও কম, নেই তেমন কোনো নিরপেক্ষ মানুষ। তার পরও এই ক্যাটাগরিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংখ্যা কমে গেলেও চারিপাশে পরিচিত সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে অগণিত অনুসরণীয় ব্যক্তি; যাদের ভালো লাগে, তাদের অনুসরণ করা। তাছাড়া, সর্বজনস্বীকৃত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব তো সমাজে রয়েছেই।
n লেখক: প্রাক্তন অধ্যক্ষ
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
জাহানাবাদ সেনানিবাস, খুলনা