করোনা ভাইরাসের কারণে বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা

সানেমের ওয়েবিনারে বক্তারা

ইত্তেফাক রিপোর্ট

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তরুণ জনগোষ্ঠী ও জেন্ডার বিষয়ক আরো বেশি গঠনমূলক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। একইসঙ্গে এই দুইটি ক্ষেত্রে অধিক গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান ও গবেষণারও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং একশন এইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তরুণ ও জেন্ডার বিষয়ক এজেন্ডার প্রতিফলন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা। ওয়েবিনারে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের জৈষ্ঠ্য গবেষণা সহযোগী ইশরাত শারমীন। ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞ আলোচক ছিলেন কারিগরী শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ সায়েদ আলী, ব্র্যাকের পরিচালক নবনীতা চৌধুরী এবং সহজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম কাদির।

অধ্যাপক বিদিশা বলেন, করোনা ভাইরাসের সময় তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ ও ‘জেন্ডার ডিভাইড’ এর বিষয়গুলো দেখতে হবে। সেইসঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধি পাওয়া, শ্রম বাজারে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ-এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে। ফারাহ কবির তার স্বাগত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তরুণ জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে প্রান্তিক তরুণ জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কি নীতি প্রণয়ণ করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, তিনটি বিষয় আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া দরকার। প্রথমত, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মহামারির চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে নিরূপণ করা, দ্বিতীয়ত অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় গৃহীত পরিকল্পনাগুলিকে পুনরায় চিন্তা করা, তৃতীয়ত সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিয়মিত ভিত্তিতে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করার প্রবণতা বাড়ানো।

প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ইশরাত শারমীন বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এমন একটি সময়ে প্রণয়ন হতে যাচ্ছে যখন জাতীয়ভাবে আমাদেরকে করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রণীত এ পরিকল্পনায় জনমিতিক লভ্যাংশ গ্রহণের যে সুযোগ, তা কতখানি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিফলিত ও বাস্তবায়িত হবে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। মূল উপস্থাপনায় বলা হয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে দরিদ্র্য পরিবারের শিক্ষার্থীরা করোনা ভাইরাসের সময়ে বঞ্চণার শিকার হচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের আগে থেকেই শিক্ষা খাতে যে বৈষম্য বিদ্যমান ছিল, তা এই সময়ে আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে কোভিডের কারণে ‘লকডাউন জেনারেশন’ এর ক্ষেত্রে ‘ইন্টারজেনারেশনাল লার্নিং গ্যাপ’ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সানেমের গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের মাত্র ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ বাড়িতে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ সুবিধা রয়েছে। অন্তত একবার কম্পিউটার ব্যবহার করেছেন এমন নারী জনগোষ্ঠীর হার মাত্র ৪ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলে ১০ এবং গ্রামে ২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে জেন্ডার, অঞ্চল ও আয়ভেদে আগে থেকে বিদ্যমান বৈষম্য মহামারির কারণে আরো বাড়বে। আগামী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাতে বৈষম্য হ্রাস, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমানো, কারিগরী শিক্ষার গুরুত্ব বহুগুণে বাড়ানো, কারিকুলামের আধুনিকায়ন হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ যা বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নেই। এক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় তরুণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদান, শ্রম বাজারে নারীদের অধিক অংশগ্রহণের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।