জয়িতা শিরিন অভাবকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প

১৯৯৫ সালে বিরামপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে বিরামপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন শিরিন সুলতানা। ঐ কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করা অবস্থায় ২০০৩ সালে পারিবারিকভাবে নওগাঁর রাণীনগরের প্রত্যন্ত গোনা গ্রামের ইদ্রিস আলী মোল্লার সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর পরিবারে মোট ৯ সদস্য হওয়ায় অনেকটা কষ্ট করে চলতে হয়। শিরিন হাতের কিছুটা কাজ জানা থাকায় প্রতিবেশীদের জামাকাপড় সেলাইয়ের কাজ করে আয় করা শুরু করেন। এরমধ্যে বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর স্বামীর ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক পদে চাকরি হলে নওগাঁ শহরের চলে আসেন।

২০০৬ সালে এক ছেলে সন্তানের মা হন। ২০০৭ সালে ‘রুপমাধুরী বিউটি পার্লার’ থেকে তিন মাসের একটা প্রশিক্ষণ নিয়ে ভাড়া বাসার তিনটি ঘরের মধ্যে একটা ঘরে নিজেই বিউটি পার্লার খুলে বসেন। বাসাতে বিউটি পার্লার হওয়ায় মানুষ কম আসত। এরপর তিনি অন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ২০০৯ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর ২০১৩ সালে নওগাঁ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন থেকে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ভর্তি হয়ে সেলাই ও ব্লক বাটির ওপর তিন মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি।

প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বুটিকসের এবং বিউটি পার্লারের প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে কার্যক্রম শুরু করেন। এছাড়া যুব উন্নয়ন থেকেই ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষক হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুই বছরের মধ্যে তিনি বুটিকসের আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করে আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে তার প্রতিষ্ঠান ‘সেজ্যোতি বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিক ফ্যাশন’ এর রেজিস্ট্রেশন করেন। তার এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর এবং রাজশাহী থেকে পাইকাররা এসে পোশাক কিনে নিয়ে যান।

অর্থনৈতিকভাবে সফলতা অর্জনকারী শিরিন সুলতানা বলেন, এক সময় অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেছি। এরপর স্বামীর বাড়িতে এসেও যুদ্ধ। আল্লাহর অশেষ কৃপায় এখন আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছলতা অর্জন করতে পেরেছি। আমার অধীনে প্রায় শতাধিক নারীকর্মী বুটিকসের কাজ করে প্রতি মাসে তারা ৩-৮ হাজার টাকা আয় করছেন। প্রতি মাসে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো থ্রী পিচ, জামা, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ ব্লক বাটিকের তৈরিকৃত অন্যান্য পোশাক বিক্রি হয়ে থাকে। যা থেকে সব খরচ বাদে প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকার মতো লাভ আসে। এছাড়া বিউটি পার্লার থেকে মাসে আসে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, এ কাজে স্বামীর সার্বিক সহযোগিতা ও উত্সাহ পেয়েছি। তার চাকরি এবং আমার ব্যবসা দুই জনে পরিশ্রম করেছি। গত ২০১৮ সালে নওগাঁ মুখীবধির বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছি। আমার কর্মজীবনের আয় দিয়ে বাবার বাড়িতে প্রায় দেড় বিঘা জমি কিনেছি। এছাড়া শহরে একটা বাড়ি তৈরি করেছি। ছেলেকে ভালো স্কুলে পরাচ্ছি। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি যেভাবে কষ্ট করে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এখন নতুন যদি কেউ বুটিকসে আসতে চায় তাদেরকে কষ্টটা কম করতে হবে। কারণ এ কাজটা শিখানোর মানুষ তখন কম ছিল। বর্তমানে যারা আসবে/আসতেছে তারা ইন্টারনেট পারদর্শী। তারা অনলাইনেও ব্যবসা করতে পারবে। যা আমরা তখন পারিনি। তবে চাকরির পেছনে না ঘুরে ঐ টাকা যদি ব্যবসার কাজে লাগাই, তবে সফলতা আসবেই। এজন্য ধৈর্যের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।