বাড়ছে সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার

বর্তমান যুগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রযুক্তির উত্কর্ষ ও সহজলভ্যতার দরুন প্রত্যেকের কাছেই পৌঁছে গেছে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। বেড়েছে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। সেই সঙ্গে এসব মাধ্যম ব্যবহারে বেড়েছে রাজনৈতিক অপপ্রচার, গুজব, হয়রানি, ধর্মীয় উগ্রবাদের মতো সহিংস অপরাধের। যার বেশির ভাগই ঘটছে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হওয়ায় বাংলাদেশও তা থেকে পিছিয়ে নেই। ডিজিটাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেপোলিওনকাটের তথ্য মতে—গত জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ৩৭ লাখ। যাদের বেশির ভাগই তরুণ ও মধ্যবয়সি। আর তাদের বিনোদন কিংবা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদ সংগ্রহে নির্ভরতা বেড়েছে ফেসবুকে। সর্বস্তরের জনগণের ফেসবুকে এমন নির্ভরতা থাকায় একশ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল ও সুযোগসন্ধানীগোষ্ঠী, বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি কিংবা দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও রাজনৈতিক অপপ্রচার করে থাকে। তরুণ বয়সের আবেগপ্রবণ ছেলেমেয়ে ও নিরক্ষর মধ্যবয়সি ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সেসব খবরের সত্যতা যাচাই না করেই ঐ খবরগুলো বিশ্বাস করছে, শেয়ার দিচ্ছে এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করছে। যার দরুন সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির, বিঘ্নিত হচ্ছে জনসাধারণের নিরাপত্তা।

বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্র জনগোষ্ঠী এক্ষেত্রে ধর্মকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। গত বছরের রংপুরে ধর্মীয় উসকানিমূলক ও অবমাননাকর ঘটনা থেকে শুরু করে কিছু দিন আগে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর জামে মসজিদে কোরআন অবমাননার ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়। যদিও এগুলো পরে গুজব বলে প্রমাণিত হয়। এছাড়াও সম্প্রতি যেসব ধর্মীয় অবমাননাকর ঘটনাগুলো ঘটছে তা খেয়াল করলে দেখা যায়—বেশির ভাগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ছড়িয়েছে। সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো ইস্যু তৈরি করে ফায়দা নেওয়ার জন্য এসব কাজ করে থাকে। কিন্তু এর প্রভাব হয় মারাত্মক। সমাজে ধর্মকে কেন্দ্র করে ভেদাভেদ সৃষ্টি হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে সম্প্রীতিময় সহাবস্থান। এছাড়াও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উত্ত্যক্তকরণের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্নভাবে মেয়েদের অপ্রীতিকর ছবি প্রকাশ করে হ্যারেজমেন্ট করা হচ্ছে। অসচেতনভাবে ব্যবহারের ফলে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। সম্প্রতি এরকম অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসেছে। এসব মাধ্যমের উপকারী দিক থাকলেও তা অসচেতনভাবে ব্যবহারের ফলে আমরা নিতে পারছি না। অপব্যবহার রোধেই একমাত্র এর সুফল নেওয়া সম্ভব। অপব্যবহার রোধ বর্তমানে প্রয়োজন হয়েও দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পারিবারিক শিক্ষা। পরিবার থেকেই একটি শিশুকে ছোট থেকেই অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। ব্যবহারকারীদের উচিত যেসব খবর এই মাধ্যমগুলোতে আসে তার সত্যতা যাচাই না করেই সে খবরগুলোতে বিশ্বাস না করা এবং কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। আবেগ দিয়ে এসব মাধ্যম ব্যবহার না করে সচেতনতার সঙ্গে ব্যবহার করা। কোনো প্রকার ফাঁদে পড়ে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার না করা। যেহেতু এটি জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর সচেতন ব্যবহার শিক্ষা দেওয়া। সর্বোপরি পারিবারিক শিক্ষা ও সচেতন ব্যবহারই পারে এই মাধ্যমের অপব্যবহার রুখে দিতে এবং নিরাপদ করতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়