কুষ্টিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দুই ছাত্র। এ সময় তাদের দুই শিক্ষক সহায়তা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনিবার রাতে তাদের গ্রেফতার করে। এরা হলেন :শহরের জুগিয়া পশ্চিমপাড়া মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আল আমিন (২৭) ও মো. ইউসুফ আলী (২৬) এবং একই মাদ্রাসার ছাত্র মো. আবু বক্কর ওরফে মিঠুন (১৯) ও মো. সবুজ ইসলাম নাহিদ (২০)। বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলার পর তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রবিবার দুপুরে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার কার্যালয়ের হলরুমে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে খুলনা বিভাগের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
এদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে ইসলামসহ যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, যদি কেউ মনে করেন, তারাই অনেক শক্তিশালী হয়ে গেছেন, এটা তাদের ভুল ধারণা। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সরকার কি হেফাজতের বিষয়ে নমনীয়— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা কারো প্রতি নমনীয় নই। যেটাই আমাদের সামনে আসছে সেটাই আমরা দেখছি। জনগণ যেটা চায় সরকার সেটাই করবে।’ দেশে কোনো ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলেও মন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাতে কুষ্টিয়া সদরের পাঁচ রাস্তা মোড়ে বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা।
যেভাবে শনাক্ত ও গ্রেফতার :পুলিশ জানায়, সিসি ক্যামেরায় ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে প্রথমে দুই জনকে শনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাদ্রাসাছাত্র মো. আবু বক্কর মিঠুনকে গ্রামের বাড়ি জেলার মিরপুর উপজেলার শিংপুর থেকে এবং সবুজ ইসলাম নাহিদকে জেলার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। এরা দুজনই জুগিয়া পশ্চিমপাড়া মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র। তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা পুলিশকে আরো জানায়, মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক ও ফয়জুল করিমের বয়ানে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে। এছাড়া ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনার বিবরণও পুলিশের কাছে তুলে ধরে তারা।
তারা জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে শহরের মজমপুর রেললাইনের পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে তারা দুজন ভাস্কর্য চত্বরে আসে এবং ভাস্কর্য নির্মাণকাজে ব্যবহূত বাঁশের মইয়ের সাহায্যে ওপরে উঠে হাতুড়ি দিয়ে ভাস্কর্য ভাঙচুর করে পালিয়ে যায়। মাদ্রাসাশিক্ষক আল আমিন ও ইউসুফ আলী তাদের মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। পরে আসামিদের স্বীকারোক্তি মতে, ঐ দুই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। আসামিদের গতকাল সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাদের রিমান্ড আবেদন করা হবে এবং এ ঘটনায় অন্য কারো সম্পৃক্ততা থাকলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়। এদিকে এ ঘটনায় গতকাল জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির প্রধান এডিএম মো. সিরাজুল ইসলাম। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট প্রদান করতে বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো যা বললেন :বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন করতে দেওয়া হবে না বলে হেফাজতের নেতারা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন—এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক তার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট করেছেন।’ সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাস্কর্যের নিরাপত্তার বিষয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। আমরা কাউকে বাড়াবাড়ি করতে দিই না। হেফাজতের কিছু নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য এ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।’ কুষ্টিয়ার ঘটনায় হেফাজতের শীর্ষ নেতারা হুকুমের আসামি হবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তদন্তে যার নাম বেরিয়ে আসবে তার নামেই মামলা হবে, এটা স্পষ্ট। সরকার এখন ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়টি রিভিউ করবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার রিভিউ করবে কি না এটা সরকারের বিষয়। আমাদের বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দেশে আরো বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো যারা ভাঙবে তারা তো নিশ্চয়ই না জেনে মূর্খতার পরিচয় দেবে। নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা অবশ্যই দেখব।’
সাংবাদিক মারধরের ঘটনায় মামলা :শনিবার রাতে কুষ্টিয়া শহরে বিএনপি অফিস ভাঙচুরের সময় সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় গতকাল দীপ্ত টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি দেবেশ চন্দ্র সরকার বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ছাত্রলীগ নেতা সাদ আহম্মেদকে প্রধান আসামি করা হয়।
এদিকে শহরের জনবহুল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, বিএনপি অফিস ও এসবি পরিবহনের কাউন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় শহরবাসীর মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য চত্বরে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিকালে পৌরসভার বিজয় উল্লাস চত্বরে জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফ। পরে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে।