একবার গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম পড়িয়াছে, যাহাদের বাড়িতে বৈদ্যুতিক পাখা নাই, তাহাদের জন্য সরকার হইতে তালপাতার হাতপাখা বিতরণ করা হইতেছে। হাতপাখা পাইয়া গরিব মানুষ ভীষণ খুশি। কিন্তু এক দিন পরই তাহারা সরকারি কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ করিল, ঐ সকল হাতপাখা দিয়া বাতাস খাওয়া যায় না। হাত দিয়া এইপাশ-ঐপাশে ঘুরাইতে গেলেই হাতপাখা ভাঙিয়া যায়। খুবই নিম্নমানের পাখা। সরকারি কর্মকর্তা সকলের অভিযোগ শুনিয়া বলিলেন, তোমরা এই হাতপাখা দিয়া বাতাস খাইবার নিয়ম জানো না, এই হাতপাখা মুখের কাছে লইয়া মুখখানি ডাইনে-বামে ঘুরাইতে হইবে, পাখা নড়াচড়া করা যাইবে না।
ইহা গল্পকথা। কিন্তু সন্দ্বীপবাসীর ক্ষেত্রে এমন গল্পকথাই যেন ভিন্নভাবে সত্য হইয়া গিয়াছে। তেরো ও পাঁচ বত্সর পূর্বে তাহারা সরকারের মাধ্যমে দুইটি সি-অ্যাম্বুলেন্স পাইয়াছিল। কিন্তু আজও অবধি অ্যাম্বুলেন্স দুইটির চালক দেওয়া হয় নাই। জ্বালানিরও বরাদ্দ নাই। অবশ্য বরাদ্দ থাকিলেও খুব অধিক লাভ হইত না। কারণ, সি-অ্যাম্বুলেন্স দুইটির উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার মতো ফিটনেস নাই। বাধ্য হইয়া সন্দ্বীপবাসীর গুরুতর অসুস্থ রোগীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ট্রলারে কিংবা স্পিডবোটে করিয়া ১৪ নটিক্যাল মাইল সাগর পাড়ি দিয়া চট্টগ্রামে লইয়া যাইতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকিলে তখন তাহাও অসম্ভব হইয়া পড়ে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, ১০ হইতে ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের নির্মাণত্রুটিসম্পন্ন সি-অ্যাম্বুলেন্সটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া আছে গুপ্তছড়া ঘাট-সংলগ্ন ডাঙায়। ‘রেসকিউ ঈগল’ নামের এই সি-অ্যাম্বুলেন্সটিতে রোগী নেওয়ার স্ট্রেচার সোজা করিয়া রাখিবার ব্যবস্থাও নাই। ওজনেও অত্যন্ত হালকা। এমনকি যেই ইঞ্জিন দিয়া এই ধরনের সি-অ্যাম্বুলেন্স চলিবার কথা, তাহাও দেওয়া হয় নাই। তাই ক্রয়ের পর হইতেই ইহা একরকম ডাঙাতেই পড়িয়া রহিয়াছে। অপর সি-অ্যাম্বুলেন্স পড়িয়া রহিয়াছে সন্দ্বীপের হারা মিয়ার ২০ শয্যা হাসপাতালের চত্বরে। ইহারও একই দশা। স্থানীয়ভাবে টাকা সংগ্রহ করিয়া ইহা চালাইবার উদ্যোগ লওয়া হইলেও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। কারণ এই সি-অ্যাম্বুলেন্সটিরও নির্মাণত্রুটি রহিয়াছে। অর্থাত্ দুইটি সি-অ্যাম্বুলেন্সের একটিরও উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার মতো ফিটনেস নাই। অভিযোগ রহিয়াছে যে, হাওর অঞ্চলে চলার উপযোগী সি-অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করিয়া তাহাই উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে সন্দ্বীপ পাঠাইয়াছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখন এই কোভিড-কালে স্থানীয়দের নমুনা লাইতেও চরম ভোগান্তি পোহাইতে হইতেছে সকলকে। প্রতিদিন এই উপজেলা হইতে নমুনা পাঠাইবার কথা থাকিলেও যাতায়াতের সমস্যার কারণে এখন সন্দ্বীপ হইতে চট্টগ্রামে নমুনা পাঠাইতে হইতেছে কয়েক দিন পরপর। ইহাতে নমুনার গুণমান নষ্ট হইবারও শঙ্কা থাকিয়া যাইতেছে। অর্থাত্ রোগী ও নমুনা বহনের জন্য কোটি টাকার সি-অ্যাম্বুলেন্স থাকিলেও নির্মাণত্রুটি ও চালক না থাকায় সমস্ত অর্থেরই অপচয় হইয়াছে।
কথায় আছে—সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল। এই দুইটি সি-অ্যাম্বুলেন্স যেন ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নানান সময় কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছে, কিন্তু ঐ সকল যন্ত্রপাতির জন্য কোনো অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। অর্থাত্ বহুমূল্য দিয়া তেজি ঘোড়া ক্রয় করা হইয়াছে, কিন্তু ঘোড়া পরিচালনার জন্য নগণ্য মূল্যের সামান্য ‘চাবুক’ কিনা হয় নাই। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই। স্পষ্টতই কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাইলেই সমস্যার সমাধান হয় না, দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন দায়িত্ব লইয়া ভালো কাজ করিবার সদিচ্ছারও। আমরা আশা করিব, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাস্তব-বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যার সহজ সমাধান করিতে অযথা বিলম্ব করিবেন না।