প্রায় এক বছর হয়ে গেল বিশ্ব জুড়ে করোনার প্রকোপ চলছে। গত বছর এই সময়েই চীনে প্রথম করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছিল। চীন এখন অনেকটা বিপদ কাটিয়ে উঠলেও ইউরোপ ও আমেরিকার অবস্থা ভয়াবহ। ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। আমেরিকায় রেকর্ডসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ডব্লিউএইচওর নিজস্ব হিসাবে প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গোটা বিশ্বে এক দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৬০ হাজার ৯০৫ জন। গত এক বছরে এক দিনে এতসংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হননি। করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট কোভিড-১৯ এরই মধ্যে মহামারি হিসেবে ছড়িয়েছে বিশ্বের ২১৩টিরও বেশি দেশে। গোটা ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। শীত পড়তেই ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে নতুন করে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও।
ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, ২০২১ সালের গোড়ায় ইউরোপ জুড়ে করোনার তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে এবং তাতে ক্ষতির মাত্রা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য, পাটিগণিতের হিসাবে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় না। লাফিয়ে বৃদ্ধি পায়। অর্থাত্, প্রথম সপ্তাহে যদি সংক্রমণের হার আট গুণ বাড়ে, তাহলে দ্বিতীয় সপ্তাহে তা বাড়বে ৪০ গুণ। তৃতীয় সপ্তাহে ৩০০ গুণ। চতুর্থ সপ্তাহে হাজার গুণ। এটাই করোনার বৈশিষ্ট্য। এই বিষয়টি বুঝতে না পারলে আগামী কয়েক মাসে সমস্যা বাড়বে। ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে গেলেও এখনই করোনা প্যানডেমিক বা অতিমারি কাটার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
করোনা সংক্রমণের প্রথম ধাক্কাতেই নাস্তানাবুদ হয়েছিল ইউরোপ। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি অর্থনীতি। এমনই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ফ্রান্স, জার্মানিসহ পুরো ইউরোপ। এরই মধ্যে দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানি ও ফ্রান্স। একই পথে হাঁটছে চেক রিপাবলিক ও আয়ারল্যান্ড। এর ফলে বন্ধ হয়ে গেছে এসব দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অনেক ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান। আংশিক লকডাউন ঘোষণা করেছে ইতালি, পরবর্তী লকডাউনের তালিকায় আছে স্পেন ও যুক্তরাজ্য। এমন অবস্থায় নির্মাণ ও উত্পাদনশীল খাতসহ বন্ধের মুখে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। আমাদের বাংলাদেশেও প্রতিদিন শত শত মানুষ নোভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
২০১৯-২০ করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারিটি ভ্রমণ বিধিনিষেধের পাশাপাশি ভ্রমণকারীদের মধ্যে চাহিদা হ্রাসের কারণে পর্যটনশিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে পর্যটনশিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ বহু দেশ এর বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থা অনুমান করেছে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন ২০-৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে, যার ফলে সম্ভাব্য লোকসান ৩০-৫০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। বিশ্বের অনেক শহরে পরিকল্পিত ভ্রমণ ৮০-৯০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্ব জুড়ে অনেক পর্যটন আকর্ষণ, যেমন—জাদুঘর, বিনোদন পার্ক এবং খেলাধুলার স্থানগুলো বন্ধ রয়েছে।
অন্যান্য শিল্পের মতো করোনার প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব পর্যটনশিল্প। আর পর্যটনশিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়ায় অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পতিত হচ্ছে গোটা পৃথিবী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ১১০ কোটি পর্যটক কমে যেতে পারে এবং ৯১০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি অবদান হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) তথ্যমতে, এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১০-১২ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সারা বিশ্বে ৩৩ কোটি লোক পর্যটনশিল্পে কাজ করে। এক্ষেত্রে প্রতি ১০ জনে এক জনের কর্মসংস্থান হয় এই খাতে। কিন্তু গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি চার জনে এক জনের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটনে। আশা করা হয়েছিল, ২০২০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ৩-৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে ২০১৯ সালের তুলনায়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তাতে এখন বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পে উন্নতি চোখে পড়ার মতো। নোভেল করোনা ভাইরাসের রাহুগ্রাসের প্রভাবে এ শিল্পে ধস নেমে এসেছে। সব ধরনের হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সার্বিক পর্যটনশিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ জন তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, চাকরি হারাবেন প্রায় ৭ দশমিক ৫ কোটি পর্যটনকর্মী। শুধু পর্যটন খাতে গত বছরের তুলনায় এ বছর আয় কমবে প্রায় ২৬৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসায় খাতে ভ্রমণ বাবদ ক্ষতির সম্মুখীন হবে ৮১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থা জানাচ্ছে, গত ২০ মার্চ ৯৬ শতাংশ পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কোভিড-১৯-এর প্রকোপ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ৭ মে থেকে বিশ্বের শতভাগ পর্যটন গন্তব্যে বেড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সমস্ত অঞ্চলে ভ্রমণ সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন ৭০ শতাংশ কমেছে গত আট মাসে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভ্রমণে বিধিনিষেধগুলো বিশ্বব্যাপী পর্যটনকে মারাত্মকভাবে আঘাত হানতে থাকে, বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আগমনকারীদের সংখ্যা ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে ২০২০-এর আট মাসে।
বিশ্বে করোনার প্রভাব কত দিন থাকবে, তা এখনই সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আর এর প্রভাবে লকডাউন কার্যক্রম কত দিন থাকবে, তা-ও বলা যায় না। তবে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা তিন ধরনের পূর্ভাবাস দিয়েছে। যাতায়াতে বিধিনিষেধের ওপর ভিত্তি করে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। যদি জুলাই পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকে, তবে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম হবে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হলে তা ৭০ শতাংশ হবে আর ডিসেম্বর পর্যন্ত হলে তা গিয়ে দাঁড়াবে ৭৮ শতাংশে, যা পর্যটনশিল্পের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিক নির্দেশ করছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়বে পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মসংস্থানে। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সময়ে ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন চাকরি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, চাকরি হারাবেন প্রায় ৭ দশমিক ৫ কোটি পর্যটনকর্মী। করোনার ভয়াল থাবায় শুধু পর্যটন খাতে বিগত বছরের (২০১৯) তুলনায় এ বছর (২০২০) আয় কমবে প্রায় ২৬৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসায় খাতে ভ্রমণ বাবদ ক্ষতির সম্মুখীন হবে ৮১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
আজ পর্যটন একটি বিধ্বস্ত শিল্প। অন্যান্য শিল্প হয়তো অদূর ভবিষ্যতে তাদের করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে; কিন্তু পর্যটনশিল্প এত দ্রুত পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। কারণ পর্যটন হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে কোভিড-১৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ারি জারি করেছে, করোনার উপদ্রব আগামী দুই বছরও চলতে পারে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের এই করোনা নিয়েই থাকতে হতে পারে। কোভিড-১৯ এমনই একটা মহামারি, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। এখন আমরা মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই না, কোলাকুলি করি না, হাতে হাত ধরে চলি না, মুখ থেকে মুখোশ খুলি না, একটু পরপরই স্যানিটাইজার দিয়ে হাতকে ভাইরাসমুক্ত রাখার চেষ্টা করি, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথা বলি না, যতটুকু পারা যায় দূরত্ব বজায় রেখে চলি। এগুলো তো পর্যটনের ভাষা নয়। পর্যটন হচ্ছে হূদয়ের সংযোগ, পর্যটন হচ্ছে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা, পর্যটন হচ্ছে হূদয় নিংড়ানো আতিথেয়তার পরশ। কিন্তু কোভিড-১৯ এই সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সব স্বাস্থ্যরক্ষা বিধি মেনে আমাদের চেষ্টা করতে হবে পর্যটন নামের নদীতে জোয়ার আনার।
যে কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান ও মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ অতি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে চলমান করোনা ভাইরাসের সৃষ্ট মহামারি, মহামারি নিয়ন্ত্রণ এবং এটা কত সময় ধরে চলবে তা সময়ই বলে দেবে। বর্তমান পর্যটনে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এর সঠিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সরকারের সুদৃষ্টি, সহায়তাই পারে এই শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পর্যটনশিল্প বাঁচিয়ে রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ব পর্যটন সংস্থা নির্দেশিত দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা আশা করি, কোভিড-১-এর সংকট থেকে উতরে উঠে অর্থনৈতিক মন্দা ও পর্যটন বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে নতুন আলোয় আলোকিত হবে পর্যটনশিল্প, একই সঙ্গে সমৃদ্ধির যাত্রায় এগিয়ে যাবে দেশ।
n লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।