ভ্রাম্যমাণ আদালতের আদেশে দুপুরে সাজা বিকালে মওকুফ
এইচ এম আমীন, কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা
কেরানীগঞ্জে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি এলাকাবাসীর চিকিত্সাসেবা দেওয়ার জন্য জিঞ্জিরা, আগানগর, কলাতিয়া, রোহিতপুর ও ইকুরিয়া এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ডায়াগনিস্টক সেন্টার ও হাসপাতাল। অন্যগুলো ক্লিনিক ও জেলারেল হাসপাতাল। মোট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও ড্রাগস লাইসেন্স হালনাগাদ রয়েছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের। এগুলো হলো—কদমতলী এলাকার শুভ ক্লিনিক অ্যান্ড জেলারেল হাসপাতাল, ইকুরিয়া এলাকার ইকুরিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও রোহিতপুর এলাকার রোহিতপুর জেনারেল হাসপাতাল। বাকি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের হালনাগাদ কোনো লাইসেন্স নেই। অনেকের নেই প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের হালনাগাদ সনদ। অভিযোগ রয়েছে, এসব জেলারেল হাসপাতাল ও ক্লিনিক সেবার নামে রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানে নার্স ও আয়াকে ডাক্তার সাজিয়ে সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল অপারেশন করা ছাড়াও চিকিত্সাপত্র দেওয়া হয়। ফলে ভুল চিকিত্সায় গত কয়েক বছরে একাধিক রোগীর মৃত্যুসহ অনেকে পঙ্গু হয়েছেন।
আরো জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে চিকিত্সা নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয় রোগীরা। কিন্তু কদমতলী চৌরাস্তা থেকে বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু হয়ে নয়াবাজার চৌরাস্তা পর্যন্ত সারা দিন যানজট লেগে থাকায় অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। উপায় না দেখে তাই অনেককেই কেরানীগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হয়। আর একে পুঁজি করে একশ্রেণির দালাল তাদের পছন্দের হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভুক্তভোগীদের ভর্তি করায়। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নাম ব্যবহার করলেও বাস্তবে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। জানা গেছে, এজন্য কোনো কোনো নির্দিষ্ট ডাক্তারকে দেওয়া হয় মাসোহারা।
এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৯ নভেম্বর ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাইনুল হাসান ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অমিত দেবনাথসহ মডেল থানার বন্দডাকপাড়া এলাকায় পপুলার গ্যাস্ট্রোলিভার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
এ সময় পপুলার হাসপাতালের আয়া রোজিনা আক্তার বনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকার করেন, তিনি ডাক্তার পরিচয়ে গত ১২ বছর ধরে প্রসূতি বিভাগে সিজারিয়ান অপারেশনসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিত্সাপত্র দিয়ে আসছেন। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে পপুলার গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ডিউটি পালনরত কোনো ডাক্তার পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, অপারেশন থিয়েটারে আলোর স্বল্পতাসহ বিভিন্ন অনিয়ম। একাধিক অভিযোগ ও অনিয়মের কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ হাসপাতালের আয়া রোজিনা আক্তার বনিকে এক বছর কারাদণ্ড এবং হাসপাতালের মালিক আব্দুল গফুরকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ছয় মাস অতিরিক্ত সাজা ভোগ করার আদেশ দিয়ে আটককৃদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পাশাপাশি হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। বেলা ২টায় এই আদেশ দেওয়ার পর বিকাল ৫টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ তার সাজা দেওয়ার আদেশটি অজ্ঞাত কারণে পরিবর্তন করে উভয়ের সাজা মওকুফ করে শুধু সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা নিয়েই পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই জনকে ছেড়ে দেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিচারকের এ ধরনের দ্বৈত আদেশে হতাশ তারা। আদেশ পরিবর্তনের বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ জানান, সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ায় তাদের সাজা মওকুফ করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপার ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন মাইনুল হাসান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমান হতাশা ব্যক্ত করেন।