ঘটনাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকের, ১৯৪৫ সালের। এনিয়াক নামের প্রথম কম্পিউটারের কথা পৃথিবীবাসী জানিতে পারে, যেই কম্পিউটারে প্রথম প্রোগ্রাম ইনস্টল করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর জন্য একটি পুরোপুরি ইলেকট্রনিক কম্পিউটার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হইয়াছিল। তখন তৈরি হয় এনিয়াক। এনিয়াককে তিন দেওয়াল জুড়িয়া বসানো হইয়াছিল ৫ ফুট দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট প্রস্থের ভূগর্ভস্থ বিশাল জায়গায়। উহাকে চালাইতে ৪০ জন বিজ্ঞানীর প্রয়োজন পড়িত। উহা ছিল বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা। কী আশ্চর্য! আজ মাত্র কয়েক হাজার টাকা মূল্যের সামান্য একটি স্মার্টফোনও এনিয়াক হইতে লক্ষগুণ শক্তিশালী!
এনিয়াক ও স্মার্টফোনের এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ হইল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ক্রমশ বিকশিত হইয়া উঠিতেছে। অনেকের মতো ইহা এখন এনিয়াকের আদিরূপের কাছাকাছি। কিন্তু মাত্র অর্ধশত বত্সরের মধ্যেই এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যতীত মানবসভ্যতা কল্পনা করা যাইবে না। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হইতেছে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি, কিন্তু ইহাতে মানুষের সম্পূর্ণমাত্রায় কর্তৃত্ব রহিয়াছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের জায়গা দখল করিয়া লয়? এই আশঙ্কা উড়াইয়া দেওয়া যায় না। ইহা ঠিক যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাপন অনেক সহজ ও প্রাঞ্জল হইয়া উঠিবে। কিন্তু তাহা মানবসভ্যতাকেই কোনো এক অজানা বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে লইয়া যাইতে পারে। কয়েক মাস পূর্বে ব্রিটেনের এক সংবাদপত্রে একটি উত্তর-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হইয়াছিল, যাহার শিরোনাম ছিল—‘এই নিবন্ধ একটি রোবটের রচনা। হে মানব, তুমি কি এখনো আতঙ্কিত হও নাই?’ ঐ পত্রিকা জিপিটি-থ্রি নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ল্যাঙ্গোয়েজ জেনারেটরকে দিয়া একই বিষয়ে আটটি নিবন্ধ রচনা করাইয়াছিল। সেইগুলির অংশবিশেষ লইয়া একটি নিবন্ধ তাহারা প্রকাশ করে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এমন হইবে যে, এই কলামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়ও খুব সহজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তির সাহায্যে রচনা করিয়া লওয়া যাইবে। যেইভাবে যেই বিষয় লইয়া সম্পাদকীয় চাওয়া হইবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেইভাবেই চমত্কার সম্পাদকীয় রচনা করিয়া দিবে। এখনই তো অনেক পিএইচডি গবেষকের কয়েক বত্সর ধরিয়া তৈরি করা অসাধারণ অভিসন্দর্ভ নিমেষেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম দিয়া তৈরি করা যায়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অবশ্য সেই সকল প্লাগারিজম বিশেষ সফটওয়্যার দিয়া ধরাও সম্ভব হয়। কিন্তু প্রযুক্তি যেইভাবে আগাইতেছে, তাহাতে সামনে কী হইবে, তাহা অচিন্তনীয়। ভবিষ্যতে যুদ্ধও আর মানুষে-মানুষে হইবে না। স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র দিয়াই এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করিবে। যাহার যত উন্নত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থাকিবে, তাহার তত প্রতাপ থাকিবে।
এখন প্রশ্ন হইল—কৃত্রিম বুদ্ধির নিকট কি দূর ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কের পরাজয় ঘটিবে? এই ব্যাপারেও মতভেদ রহিয়াছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যন্ত্রের বুদ্ধি কোনোভাবেই ছাপাইয়া যাইতে পারিবে না মানুষের মগজকে। যেমন বর্তমানে ‘আলফা-গো’ কৃত্রিম বুদ্ধির প্রোগ্রামে লাগে ৩০ হাজার ওয়াট শক্তি। আর মানুষের মগজের দরকার হয় মাত্র ২০ ওয়াট! কিছুদিন পূর্বে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ বিষয়ক শুনানিতে কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করেন, যখন বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজত্ব চলিবে, তখন কি মানুষের জন্য কোনো জায়গা থাকিবে? অনেকেই অবশ্য মনে করেন, সকল সময়ই সূক্ষ্ম কিছু দক্ষতার প্রয়োজন পড়িবে, যা কেবল মানুষেরই থাকে। কিন্তু আমরা তো শুরুতেই বলিয়াছি, কৃত্রিম বুদ্ধির এনিয়াক যুগে আমরা রহিয়াছি। সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য ফ্রাংকেনস্টাইন হইয়া উঠিবে কি না-তাহা স্পষ্ট নহে। তবে ব্রিটেনের পত্রিকায় লেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সতর্কবার্তাটি কিন্তু ভীষণ তাত্পর্যপূর্ণ।