এনামুল হক, খুলনা অফিস
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড খুলনার কাস্টমস হাউস শাখায় ছয়টি খাতের শতাধিক ঋণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ঐ শাখায় সম্পন্ন হওয়া অডিটে অনিয়মে এসব চিত্র ফুটে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উল্লেখযোগ্য ছয়টি আলাদা খাতে শতাধিক ঋণে মোটা অঙ্কের অর্থের অনিয়ম প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে পার্সোনাল ঋণ, স্মল বিজনেস ঋণ, মাইক্রোক্রেডিট ঋণ, বাইসাইকেল ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ (এসএমই) ঋণ, রিমারকস এসএমই ঋণ রয়েছে। অনিয়মগুলো যখন হয়েছিল, শাখার সে সময়কার ম্যানেজার নাজমুন নাহার (এসপিও) এবং ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তা (এসও) মনিরুজ্জামান এসব অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ব্যাংকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত ১ জুন অডিট টিম খুলনার কাস্টমস হাউস শাখা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ঋণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পায়। এরমধ্যে পার্সোনাল ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিপত্র/ইশতেহার মোতাবেক একই প্রতিষ্ঠান থেকে জামিনদার নেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকটি ঋণের শর্ত পূরণ করা হয়নি। যার মধ্যে ঋণগ্রহীতা রিতা রাণী খুলনা সিটি করপোরেশনের একজন স্বাস্থ্য সহকারী। কিন্তু জামিনদাতা বিশ্বজিত্ সরকার একজন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক।
অপর ঋণগ্রহীতা জাহাঙ্গীর আলম মোংলা কাস্টম হাউজের একজন পোস্টম্যান। কিন্তু তার জামিনদাতা বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের কম্পিউটার অপারেটর। আবার ঋণগ্রহীতা বিশ্বজিত্ সরকার মঞ্জুরিপত্র অনুযায়ী স্থানীয় কাঞ্চননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। কিন্তু গ্রাহকের প্রদত্ত কাগজপত্রে তাকে স্থানীয় চুকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার মঞ্জুরিপত্রের ঋণগ্রহীতা বিশ্বজিত্ সরকারকে জামিনদাতা হিসেবেও দেখানো হয়েছে, যা ঋণের ডকুমেন্ট তৈরির ব্যাপারে চরম অবহেলার শামিল বলে অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি এ শাখার তত্কালীন ম্যানেজার বেগম নাজমুন নাহার এবং ঋণ প্রদানকারী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের খামখেয়ালি ও অবহেলা বলেও মন্তব্য করা হয়। অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়, পার্সোনাল ঋণে একই ব্যক্তি একাধিক ঋণের জামিনদাতা হয়েছেন। এরমধ্যে মোংলা কাস্টম হাউজের ট্রেজারার প্রদীপ কুমার মিস্ত্রী একাই দুটি ঋণের জামিনদাতা হয়েছেন, যা বিধিবহির্ভূত। একইভাবে রিমার্ক স্মল বিজনেস লোনে মঞ্জুরিপত্রের শর্তানুসারে আটটি ঋণের ক্ষেত্রে ঋণসীমার ১০ শতাংশের ওপর এফডিআর রাখা হলেও এর বিপরীতে সিকিউরিটি ডেলিভারি লেটার এবং এগ্রিমেন্ট ফর প্লেস অফ সিকিউরিটিজ নেওয়া হয়নি।
অপরদিকে, নিরীক্ষা তারিখে ব্যাংকের শাখায় মাইক্রোক্রেডিটের ঋণের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। এরমধ্যে ক্ষুদ্র খামার ঋণে মঞ্জুরিপত্র প্রদান না করা এবং একটি ঋণের নথি নিরীক্ষা দলের কাছে উপস্থাপন করতে না পারা উল্লেখযোগ্য। একইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ঋণের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক ঋণের জামিনদাতা হয়েছেন, যা অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত। অডিট আপত্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, মো. মনিরুজ্জামান ব্যাংকের এ শাখার একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেই আটটি ঋণের জামিনদাতা হয়েছেন। ঐ ঋণের অধিকাংশই একই পরিবারের সদস্য এবং অধিকাংশই জামিনদাতাদের পরিবারের সদস্য বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এসব বিষয়ে তত্কালীন ম্যানেজার (বর্তমানে খুলনার প্রিন্সিপ্যাল অফিসে কর্মরত) বেগম নাজমুন নাহার বলেন, ‘ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অডিটে তার বিরুদ্ধে যে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, তা সাউথ সেন্ট্রাল রোড ও নিউ মার্কেটসহ ব্যাংকের সব শাখাতেই আছে। আমরা গ্যারান্টার না হলে লোন দেই না। এটা কোনো অনিয়ম বলে মনে হয় না।’ এ ব্যাপারে ব্যাংকের প্রিন্সিপ্যাল অফিসের ডিজিএম মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে টুকিটাকি অনিয়ম হয়েছে। একজনকে দুটি ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর একটি ইতিমধ্যে আদায় হয়েছে। তবে বড় কোনো অনিয়ম হয়নি। তার পরও ঋণ আদায়ে ‘বেগম নাজমুন নাহারকে প্রচণ্ড চাপে’ রাখা হয়েছে। এখন ভালো আদায় হচ্ছে।” ব্যাংকের খুলনা বিভাগীয় জিএম মো. রেজাউল করিম বলেন, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।