১০ ডিসেম্বর ২০২০ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ৭৩ বছরে পা দিল। দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ৩৬০ ভাষায় অনুবাদকৃত দলিল হিসেবে মানবাধিকার শিক্ষা ও জ্ঞান সর্বত্র ছড়িয়ে এটা আজ মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করার জীবন্ত দলিল। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন—এসব মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে বৈষম্য দূরীকরণ ও দারিদ্র্যবিমোচন করাই মানবাধিকার। কিছু দিন আগে জাতিসংঘে ভার্চুয়াল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথাই পরিষ্কারভাবে বলেছেন। প্রয়োজন শুধু ব্যাবহারিকতায় আনা। স্বসম্পদে দেশজ চিন্তায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় মানবাধিকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যার বিশাল দৃষ্টান্ত ‘পদ্মা সেতু নিজের টাকায় করব’ এর দৃঢ়তা।
২০০৯ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার মিজ নাভিও বলেছিলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য বহুমুখী আকার ধারণ করেছে। যে ব্যক্তি নিজে বৈষম্যের শিকার হয় না তার পক্ষে এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগ অনুধাবন করা নিতান্তই কঠিন’। সবার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা চাই এবং তা বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায্যতা সৃষ্টির মাধ্যমেই সম্ভব। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় প্রতিটি লোকই ভোররাতে কাকডাকা সকালে সব ধর্মের সাধারণ লোকেরা বিছানা ছেড়ে জেগে ওঠে এবং যার যার কাজে—যেমন প্রার্থনা, কৃষিকাজ, শ্রমকাজ ইত্যাদির জন্য মাঠেঘাটে নেমে যায়। যার যার দেশের আঞ্চলিক, ভৌগোলিক, মৌলিক অধিকারসহ স্বাস্থ্য শিক্ষাকে রেখেই প্রতিপাদ্য ঠিক করাই প্রযোজ্য। ২০২০-এর প্রতিপাদ্য ‘মানবাধিকারের ডাক-পুনরুদ্ধার হোক’ যা বিশ্ব প্রতিপাদ্যকে মূল রেখে স্ব স্ব দেশে এমনকি আঞ্চলিক, পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায়েও প্রায়োগিক কার্যকর বিষয় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। যেমন কানাডার শিক্ষার অধিকার নিয়ে আলোচনায় কানাডার টরেন্টোতে টরেন্টো ওম্বাড্সম্যান আয়োজনে ঐ বছর ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষ্যে এক আলোচনাসভায় আমি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। ঐ দিনের আলোচনায় কানাডার শিক্ষার অধিকার নিয়ে মূল বিষয়টি গুরুত্বে আসে, কীভাবে পরিবেশ, ক্লাসরুম, বইখাতা, যাতায়াত, খাওয়া, স্বাস্থ্য শিক্ষা আরো বৃদ্ধি করা যায়। অন্য পক্ষে উন্নয়নশীল/গরিব দেশে শিক্ষার হার, ক্ষুধার যন্ত্রণায় স্কুলেই যেতে পারে না, মান, বৈষম্য, স্কুল ভবন, মাঠ ইত্যাদি নিয়ে কোনো কথাই উঠে আসেনি। আমাদের দেশে যেখানে দরিদ্রতার জন্য স্কুলেই যেতে পারে না, সেখানে এই ধনী-গরিব আলোচনার বৈষম্যে মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা উঠালে সবারই কপাল কুঁচকি দিয়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে থাকবে বরং এক মহিলা দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমাদের সেই দেশ! যেখানে শিশুরা ফুটপাতে শুয়ে থাকে!’ মানবাধিকারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ‘ভোটের অধিকার, মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে হবে।
দারিদ্র্যের মূল কারণ বৈষম্য। বণ্টনব্যবস্থা সুষম হলে বৈষম্য থাকবে না। মানবাধিকার Violation-এর পণ্য হলো দরিদ্রতা। প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামো বৈষম্যকে সমর্থন করে ও এর পক্ষে কাজ করে। ক্ষমতায় আসীনদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ক্ষমতা কাঠামো দুর্নীতিকে লালনপালন করতে হয়। নীতিনির্ধারকদের বক্তৃতায় এমনকি আইনেও বা দুর্নীতি দমন কমিশন অবস্থান ও বৈষম্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা থাকলেও কার্যত বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসা যাচ্ছে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর-ব্যাবহারিকতায় আনয়নে অধিকারবাদীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। নির্যাতন, ধর্ষণ, মানব পাচার ও মিয়ানমারের মাতৃভূমি থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত—এসব বিষয় সমাধান শুধু বুলিতে না হয়ে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অধিকার সুরক্ষার কাঠামোতে আনতে হবে। রাষ্ট্রের সুশাসন সূচকে মানদণ্ড ১. জবাবদিহিতা ২. স্বচ্ছতা ৩. অংশগ্রহণ ৪. আইনের শাসন ৫. দায়িত্বশীলতা ৬. কার্যকারিতা এবং পারঙ্গগমতা ৭. স্বাধীনতা, অধিকার ও সমতা ৮. ঐকমত্য ৯. কৌশলগত রূপকল্প—এই ৯টি সূচকের প্রতিটির সঙ্গে প্রতিটি সংশ্লিষ্ট ও সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দলিলেও ন্যায্যতা ও সমতার কথা বলা আছে। আমাদের দেশে স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপকল্প অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীভুক্ত সব কর্মসূচিকে সমন্বিত করে এগিয়ে যাওয়াই আজকের দিবসের মূল ডাক। বৈষম্য দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে ডর্প অনুশীলনকৃত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত মা-কেন্দ্রিক ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ ও ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ বিনিয়োগে রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার বাস্তবায়নের পথ রচনা করতে হবে। তাহলেই অধিকারহারা গরিব জন্ম হবে না। নতুবা প্রতি বছর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষ্যে এ ধরনের সুন্দর সুন্দর ডাক আসতে থাকবে, আনুষ্ঠানিকতা চলতেই থাকবে। শোষিত নিপীড়িত, বঞ্চিতরা বৈষম্যের খপ্পরে আটকে-ই থাকবে। বেরিয়ে আসার শুধু হাতছানিই থাকবে, মুক্তির পথ আসবে না। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ আদম সন্তানের সলিল সমাধিতে অধিকার বাণী নিভৃতে রয়ে যায় যা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে স্মরণ করিয়ে দেয় পাকিস্তানের শোষকদের থেকে অধিকারমুক্তির লক্ষ্যে ১৯৭১-এ যুদ্ধ ঘোষণা ও আমাদের স্বাধীনতা। ১০ ডিসেম্বর ১৯৭০ আমার জন্য স্মরণীয় যে, ঐ দিন থেকেই মানবাধিকার পুনরুদ্ধার সংগ্রামে আমারও পথচলা শুরু হলো। যা আজ ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে।
n লেখক :প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদ—বামাসপ।