প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই যেখানে নারী, সেখানে তাদের পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ না দিলে সমাজও এগোতে পারবে না। সমাজের অর্ধাংশকে আমরা যদি এগোতেই না দেই, তাহলে কী করে একটা সমাজ দাঁড়াতে পারে? সমাজকে তো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে। সরকার সমাজের সর্বস্তরে নারীদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে তারা সাহসিকতার সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে অবদান রাখতে পারে। আমাদের এই সমাজে যেহেতু নারী-পুরুষ সকলে সমান অধিকার নিয়ে কাজ করতে পারে, সেই সুযোগটা সৃষ্টি করেছি বলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত বেগম রোকেয়া পদক-২০২০ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকার জন্য পাঁচ জনকে চলতি বছরের বেগম রোকেয়া পদক দেওয়া হয়। নারী শিক্ষায় অবদানের জন্য অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার, নারীদের পেশাগত উন্নয়নে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমা বেগম, নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মঞ্জুলিকা চাকমা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফি এবং নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদা আক্তার এ বছর বেগম রোকেয়া পদক পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পদক জয়ীদের হাতে সম্মাননা, সনদ ও চেক তুলে দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে সে সমাজের নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। একটা সমাজকে যদি উন্নত করতে হয়, তারা (নারী) সমানভাবে যদি নিজেদের তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই সমাজ কীভাবে গড়ে উঠবে? আজকে আমাদের মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে। আমরা চাই আমাদের দেশের মেয়েরা সমানভাবে এগিয়ে যাক। কারণ বেগম রোকেয়াই আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন। আমাদের মেয়েরা যাতে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে সেটা নিশ্চিত করে দিয়েছি এবং সেইভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই উদ্যোগের ফলে আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের কাছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচন করা হচ্ছে। কাজেই সেদিকে লক্ষ্য রেখেই স্বাধীনতার পর আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নেই। যার ফলে আজকের বাংলাদেশ। আমি বলব যে, নারীদের ক্ষমতায়নে আমরা যথেষ্ট অগ্রগতি পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্মদিন। একই দিন ( ৯ ডিসেম্বর) তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলেরও জন্মদিন। আমি আমার মেয়ে সায়মার জন্য আপনাদের কাছে দোয়া চাই। সেও সমাজে প্রতিবন্ধী এবং অটিস্টিক যারা, তাদের নিয়ে করে যাচ্ছে। আজকে তারই উদ্যোগে জাতিসংঘ রেজুলেশন পাশ হয়েছে এবং এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।’
সমাজে নারীর ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে নিজের মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথাও স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মা, যিনি সারাজীবন আমার বাবার পাশে থেকে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। যখন আমার বাবা জেলে থাকতেন, তখন দল গঠন থেকে শুরু করে আন্দোলন সংগ্রাম করা বা তার মামলা মোকদ্দমা দেখা বা আমাদেরকে মানুষ করা, লেখাপড়া শেখানো—সব দায়িত্ব কিন্তু আমার মা নিজে করেছেন।’
তিনি বলেন, সেখানেও দেখি সমাজে কত বড় দায়িত্ব পালন করে গেছেন আমার মা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। অথচ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তার ছিল না।
সেই সময়ের সমাজে নারী শিক্ষার বাধাগুলো দূর করতে বেগম রোকেয়ার সংগ্রামের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেগম রোকেয়া তার ভাইয়ের থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, পরবর্তীতে স্বামীর থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তার নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে নারীদের স্কুলে আনতে গেলে সেই সময় অনেক বাধার মুখোমুখি হতে হত তাকে। অনেক কষ্ট করেই তিনি শিক্ষার আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে যান আমাদের জন্য।
১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে যায়, সে কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যে একটা অবিচারের ধারা বাংলাদেশে অব্যাহত ছিল, সেখান থেকে বাংলাদেশকে একটা সুবিচারের দিকে নিয়ে আসা এবং মানুষকে সহযোগিতা করা, এটাই আমাদের কাজ। জাতির পিতা যে আদর্শ রেখে গেছেন সে আদর্শ নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এটা শুধু আমাদের বাংলাদেশে না, এটা বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে হেল্প লাইন ৯৯৯ চালুসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার পদক্ষেপ নিয়েছি। যাতে সমাজে নারীরা যেন নির্যাতিত না হয়। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করেছি।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে রোকেয়া দিবসের এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তার। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণ করেন বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় মারা যান।