সড়ক দুর্ঘটনা :আর কত লিখিব!

বাংলাদেশে প্রতিদিনই সড়কে ঝরিতেছে প্রাণ। পৃথিবীর সকল দেশেই কমবেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে সড়কে মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামিতেছে না, বরং ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে। প্রতিদিনই খবরের কাগজে ভাসিয়া উঠিতেছে বীভত্স সকল লাশের ছবি। ইহা আমাদের গা-সহা হইয়া গিয়াছে বলিয়া অনেক সময় মনকে তেমন আবেগতাড়িত করে না আর। তবে মাঝেমধ্যে এমন সকল ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যাহা আমাদের হূদয়ে দাগ কাটিয়া যায়। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী গত বুধবার সাতক্ষীরার ভোমরায় ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকেল চালক ও একজন আরোহীসহ দুই জন নিহত হইয়াছে। ইত্তেফাকের চলতি মাসের ফাইল পর্যবেক্ষণ করিলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় এক দিনেই ১৭ জন নিহত হওয়ার খবর আসিয়াছে। যেমন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বাসচাপায় মা-মেয়েসহ অটোরিকশার আট যাত্রী নিহত হওয়ার পাশপাশি একই দিন দেশের অন্যান্য স্থানে নিহত হইয়াছে ৯ জন। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে বাসচাপায় একই পরিবারের ছয় জন এবং টাঙ্গাইলে আরো ছয় ব্যক্তি নিহত হইয়াছে সড়ক দুর্ঘটনায়। এমনও ঘটিয়াছে যে, বরযাত্রীরা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়িয়া বর-কনেসহ উভয় পরিবারের অনেকে হতাহত হইয়াছেন। এইভাবে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে বহু পরিবারে মর্মন্তুদ কাহিনির জন্ম দিতেছে।

সড়ক দুর্ঘটনা কেন ঘটে? ইহা লইয়া কম গবেষণা হয় নাই। সুপারিশও কম করা হয় নাই। কিন্তু ইহাতে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়াছে, এমন দাবি কেহ করেন নাই। চালকের অসতর্কতা, অসচেতনতা, অদক্ষতা, বেপরোয়া মনোভাব বা অনিয়ন্ত্রিত গতি, অতিরিক্ত পরিশ্রমে চালকের ঘুমঘুম ভাব, নিয়ম না মানিয়া ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা, ওভারলোডিং, ভাঙাচোরা সড়ক বা রাস্তা, পথচারীর অসচেতনতা ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ, যাহা আমাদের অনেকেরই জানা। তবে আমরা রোড ইঞ্জিনিয়ারিং, সড়কে সাইন-সিম্বল ও আইন মানার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করিতে চাই। বাংলাদেশে রোড ইঞ্জিনিয়ারিং বলিতে কিছু আছে বলিয়া মনে হয় না। মহাসড়কগুলির অসংখ্য বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ। সড়ক থাকিলেও পর্যাপ্ত ফুটপাত নাই, ওভারব্রিজ নাই। রাস্তার পাশে এমনকি উপরেও দিব্যি চলিতেছে হাটবাজার। মহাসড়কগুলিতেও চলিতেছে ধীরগতির যানবাহন। সড়ক নির্মাণে ৫০ বত্সর বা এক শতাব্দীর মহাপরিকল্পনা দরকার। ইহা ছাড়া অনেকেই আইন মানিতে চাহেন না। ট্রাফিক আইন অমান্য করেন অহরহ। আবার আইন যে মানিবেন, তাহার জন্য সাইন-সিম্বল দেওয়া জরুরি। নতুবা তাহারা কী দেখিয়া আইন মানিবেন? এই জন্য সর্বত্র সাইন-সিম্বল দিতে হইবে।

এক-একটি সড়ক দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের জন্য সমস্ত জীবনের কান্নাস্বরূপ। নিহত স্বজনদের আর্তচিত্কার আকাশে-বাতাসে প্রকম্পিত হইতেছে। আমরা এই স্বজন হারানোর বেদনা উপেক্ষা করিতে পারি না। এই জন্য সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে আমাদের নূতন করিয়া চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগ দরকার। কিছুদিন পূর্বে বেসরকারি সংস্থা নিচসার (নিরাপদ সড়ক চাই) ২৭ বত্সর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলিয়াছেন, নিরাপদ ও ভ্রমণবান্ধব সড়ক নেটওয়ার্ক গড়িয়া তোলা সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ আংশিকভাবে বাস্তবায়ন করিলে চলিবে না, ইহার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হইবে। সরকার, চালক, মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী-সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান হইতে আন্তরিক, সতর্ক ও সচেতন হইতে হইবে।