কেরানীগঞ্জে ফের উত্পাত ‘মোটরসাইকেল বাহিনী’র

ঢাকার পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জে আবারও উত্পাত বেড়েছে কথিত ‘মোটরসাইকেল বাহিনী’র। স্থানীয়দের জমি দখল, বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, মাদকের ব্যবসা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে গড়ে তোলা এই মোটরসাইকেল বাহিনীর নেতারা সর্বশেষ চেষ্টা করেছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটিতে ঢোকার। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত থাকায় কমিটিতে এই বাহিনী নেতাদের ঠাঁই দেননি। ইউসুফ চৌধুরী সেলিমকে আহ্বায়ক করে কয়েক দিন আগে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। মোটরসাইকেল বাহিনীর নেতারা কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা খুশি।

কেরানীগঞ্জের এই ‘মোটরসাইকেল বাহিনী’র কর্মকাণ্ড নিয়ে এ বছরের মার্চে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। তারা হলেন নবী, মোজাম্মেল ও কাদির। এসময় তাদের কাছ থেকে দুটি মোটরসাইকেলও জব্ধ করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। ‘কাঁঠালতলী গ্রিন সিটি’র অফিস ভেঙে কোম্পানির জমি বেদখল করতে যায় কথিত মোটরসাইকেল বাহিনীর সদস্যরা। কাঁঠালতলী গ্রিন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে জানান, স্থানীয় হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্দেশে তার কোম্পানির কার্যালয়ে হামলা করতে যায় মোটরসাইকেল বাহিনীর সদস্যরা।

জানা গেছে, কেরানীগগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন নিজেকে আহ্বায়ক ও হাবিবকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের জন্য প্রস্তাব জমা দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে। অন্যদিকে স্থানীয় ও ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম শফিকুল আজম খানকে আহ্বায়ক ও আলতাফ হোসেন বিপ্লবকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে কমিটির গঠনের প্রস্তাব দেন দলের কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত ইউসুফ চৌধুরী সেলিমকে আহ্বায়ক করে কমিটি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, স্থানীয় ‘মধু সিটি’ হাউজিংয়ের হাবিব পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। হাবিবের বাবা মধু মাঝিও সম্পৃক্ত ছিলেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে। স্থানীয় এক নেতার হাত ধরে হঠাত্ ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন হাবিব।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘মোটরসাইকেল বাহিনী’ চক্রের সদস্যরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে পেয়েছেন এই মোটরসাইকেল। ‘কাজ তুলে দেওয়া’র যোগ্যতা অনুযায়ী চক্রের দুই শতাধিক সদস্য মাসে ‘সম্মানি’ পান সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই চক্রের ভয়ে নিজেদের জমিজমা ছেড়ে স্থানীয়দের অনেকে এলাকা ত্যাগ করে মাসের পর মাস ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ‘অনুমতি’ ছাড়া এই এলাকায় কেউ নিজেদের জমিতেও স্থাপনা নির্মাণ করতে পারেন না। ‘অনুমতি’ কিংবা ‘বোঝাপড়া’ ছাড়া কেউ এলাকায় কোনো প্রকল্প বা স্থাপনা করতে গেলে চক্রের নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হুকুমে ১০ মিনিটের মধ্যেই জড়ো হয়ে যান ‘মোটরসাইকেল বাহিনী’। শুরু করেন মারধর, ভাঙচুর ও উচ্ছেদ।

ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও নবগঠিত কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবু সিদ্দিকের অভিযোগ, এই মোটর সাইকেল বাহিনীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তিনি বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। এদিকে, ‘মধু সিটি’র বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গার শাখা নদী, খাল ও সরকারি খাস জমি বেদখলেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঢাকার জেলা প্রশাসককে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, ‘মধুসিটি রিভারভিউ হাউজিংয়ের দখলকৃত বুড়িগঙ্গা শাখা নদীর, তিনটি খাল ও চলাচলের তিনটি রাস্তাসহ মোট ১৮ একর জমি উদ্ধার ও দখলকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’ এ ব্যাপারে মধুসিটির অন্যতম মালিক সলিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্থানীয় একটি চক্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিল। পরে ডিসির কার্যালয় সবকিছু মেপে কোনো অনিয়ম পায়নি।’