শফিকুর রহমান রয়েল
৯ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে সিরিয়ার অবকাঠামোর অবস্থা বলতে গেলে কঙ্কালসার। সম্মুখ সমরের পাশাপাশি সরকারপন্থি ও তাদের রুশ মিত্রদের যত্রতত্র বোমাবর্ষণে কোনো কিছুই আর অক্ষত নেই। শুধু খাদ্য ও বিদ্যুত্ উত্পাদনেই ধস নামেনি, অন্যান্য শিল্পোত্পাদনেও নেমে এসেছে বিরাট পতন। এখানেই শেষ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ লেবাননের অর্থনীতিও ধুঁকছে সিরীয় শরণার্থীদের টানতে গিয়ে। পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকগুলোর দেউলিয়া হয়ে পড়া ঠেকানোর উদ্দেশ্যে বাধ্য হয়েই লেবানন তার মুদ্রা নীতিতে এনেছে বিরাট পরিবর্তন। সেই সঙ্গে আটকে দেওয়া হয়েছে লেবাননের ব্যাংকগুলোতে সিরীয় ব্যবসাসমূহ সম্পর্কিত জমা থাকা কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অভিযোগ, লেবানিজ ব্যাংকগুলোতে জমা রয়েছে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণের সিরীয় আয়। তার দাবি, এগুলো আনা গেলে সিরীয় অর্থনৈতিক সমস্যার চটজলদি সমাধান সম্ভব। সিরিয়ার মুদ্রার মান পড়ছে অনবরতই। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে রকেটের গতিতে। লেবানিজদের খুব কম লোকই এখন স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে; কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় জীবনযাপন এর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। ভর্তুকি দেওয়া রুটি কিনতে সেখানে লম্বা লাইন চোখে পড়ে। ফুয়েল স্টেশনগুলোতে গাড়ি পার্ক করে রাখতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সিরীয় নাগরিকরা অভিযোগ তুলছে যে, তাদের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য ও জ্বালানি সমস্যা চলছে। বিদ্যুত্ উত্পাদন খুবই কমে যাওয়া এবং তেল দিয়ে জেনারেটর চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়াতে সেখানে ব্যবসা পরিচালনাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ৯০ লাখ ৩০ হাজার সিরীয় নাগরিক এমন অনিশ্চয়তায় থাকে যে, তাদের পরবর্তী খাবারটা কোথা থেকে আসবে বা আদৌ আসবে কি না? অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এমন লোকের সংখ্যাটা ছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বলা হয়ে থাকে ‘রুটির ঝুড়ি’। কিন্তু এই অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের কুর্দি মিত্র খ্যাত সিরিয়ার গণতান্ত্রিক শক্তি। খাদ্য সরবরাহের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো চুক্তি হয়নি। এক সময়ের গম রপ্তানিকারী দেশ সিরিয়া এখন অনেকটাই রাশিয়ার সাহায্য বাবদ গম সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কোভিড-১৯ একেবারে চরম অবস্থায় রাশিয়া নিজেদের খাদ্য রিজার্ভ বাড়াতে গিয়ে বিদেশে গম বিক্রি একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সাহায্য কমিয়ে দেওয়ার ধকল এখন পর্যন্ত সইতে হচ্ছে নাগরিকদেরকে। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেল ও গ্যাসের ব্যাপারে অবরোধ আরোপ করায় ইরানের অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। মৌলিক সম্পদগুলোর অভাবে সিরিয়ার কৃষি ও জ্বালানি খাতের ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সংগতকারণেই তার রেশ পড়ছে স্থানীয় সব ব্যবসাতেই আর এসব সমস্যা থেকে একেবারে বেরিয়ে আসার একটা উপায়ই খোলা আছে—দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পরিসমাপ্তি।
—ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন অনুসারে