একুশে পদক ও অন্যান্য পুরস্কার প্রদান প্রসঙ্গে

বিশ্বের সব দেশে নাগরিকদের সুপ্ত প্রতিভার সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এদেশেও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক। সাহিত্য ও গবেষণার জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, তৃতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এছাড়া অন্যান্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার তো রয়েছেই।

এসব পুরস্কার প্রদান করা উচিত দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রার্থীর যোগ্যতার ভিত্তিতে। এর ব্যতিক্রম হলে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও বিতর্কিত হয়ে পড়ে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, যোগ্যতার বিবেচনা না করে দলীয় স্বার্থে অনেক ব্যক্তি এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিকেও পুরস্কৃত করা হয়েছে। দলীয় স্বার্থে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে পুরস্কৃত করলে পুরস্কার প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। পুরস্কারের মান বা গুরুত্ব থাকে না।

বিভিন্ন সরকারের আমলে মরণোত্তর পুরস্কার প্রদানের একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। পুরস্কার দেওয়া হয় ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরো ভালো কাজের প্রেরণা হিসেবে। একজন লেখক মৃত্যুর পর পুরস্কার পেলে তাঁর কী লাভ? তাঁর পরিবারকে যদি আর্থিক সাহায্য প্রদানের উদ্দেশ্য থাকে সেটা অন্যভাবেও দেওয়া যায়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘জীবনে যারে কভু দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল।’ কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘মানুষটা মরে গেলে যদি তাকে অসুধের শিশি কেউ দেয়—বিনি দামে—তবে কার লাভ—।’ আমার ধারণা, মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয় নিজ দলীয় যোগ্য প্রার্থী না পেলে সরকারের প্রতিপক্ষের কোনো যোগ্য প্রার্থীকে কৌশলে এড়িয়ে যাবার উদ্দেশ্যে। এই প্রবণতা পরিহার করা উচিত। তা না হলে যারা ভালো কাজ করে তারা উত্সাহ হারিয়ে ফেলবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পুরস্কারের জন্য কোনো প্রত্যাশিত যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সরকারের সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত ব্যক্তিরা তাঁদের দেশে আইডলের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। তাঁদের আদর্শে দেশবাসী উজ্জীবিত হয়। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত অনেক ব্যক্তিকে দেখা গেছে—তাঁরা রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেন, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থি দায়িত্বহীন কাজও করে থাকেন। এসব কাজে তাঁদের নিরুত্সাহিত করার জন্য তাঁদের পুরস্কার বাতিলের বিধান রাখতে হবে। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মূল্যায়ন শেষ নয়। নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির পুরস্কার পরবর্তীকালে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতাবিরোধী ভূমিকার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোবেল লরিয়েটরা বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের বিধিমালায় বাতিলের বিষয়টি না থাকায় তা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকার অভিযোগে পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তির পুরস্কার বাতিলের দৃষ্টান্ত রয়েছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশেও বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রাপ্ত পুরস্কার বাতিল করা যেতে পারে। এতে পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থার মর্যাদা বাড়বে। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিও নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি সমাগত। এ সময় একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হবে। তার আগেই পুরস্কার প্রদান নীতিমালায় এই বিধানটি রাখা বাঞ্ছনীয়। ব্যক্তি যত ক্ষমতাবান বা প্রতিভাবানই হোন না কেন, বিতর্কিত হলে তিনি পুরস্কারপ্রাপ্তির যোগ্যতা হারাবেন। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জাতীয় সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা