টেকনাফের ইয়াবা নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে বিনা পুঁজিতে

মিয়ানমার থেকে সীমান্ত দিয়ে টেকনাফে ইয়াবা পাচারে কোনো বিনিয়োগ লাগে না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে ইয়াবা নিরাপদে পৌঁছানোর পর মিয়ানমারের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পরিশোধ করতে হয়। বাহকের কাজ হচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে টাকা জমা দিয়ে আকর্ষণীয় কমিশন নিয়ে নেওয়া। ফলে মিয়ানমার থেকে পাঠানো ইয়াবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও এদেশের মাদক ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। ইয়াবা পাচারে এ ধরনের ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক হলেন বহুল আলোচিত হাকিম ডাকাত। আব্দুল হাকিম নামে এই রোহিঙ্গা নাগরিক প্রায় অর্ধশত নিয়ন্ত্রক দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদার আব্দুল হাকিমের বাড়ি টেকনাফের নাইতংপাড়ার বৈদ্যগুনাহ এলাকায়। সম্প্রতি হাকিম ডাকাতের অবস্থান জানতে পেরে র্যাব অভিযান চালিয়ে তার আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। হাকিম ডাকাত এখন ফেরারি থেকে ইয়াবা ব্যবসার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে।

গত ১ আগস্ট রাতে টেকনাফের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর গ্রেফতার আতঙ্কে ইয়াবা কারবারিরা গা ঢাকা দেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায় অর্ধশত স্পট দিয়ে দেদার ইয়াবা পাচার করে আসছে ঐ পাচারকারীরা। নতুন পদ্ধতিতে ইয়াবা নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে হাকিম ডাকাত।

এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, মেজর (অব.) সিনহার ঘটনার পর যে র্যাবের ইয়াবার বিরুদ্ধে অভিযান থেমে গেছে—অভিযোগটি সঠিক নয়। বরং ঐ ঘটনার ১০/১৫ দিন পর র্যাব অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮ লাখ ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে। এই ছয় মাসে র্যাব অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

র্যাব জানায়, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার অর্ধশত স্পট দিয়ে ইয়াবা পাচার চলছে। বেশির ভাগ স্পট নিয়ন্ত্রণ করছে রোহিঙ্গা নাগরিকরা। হাকিম ডাকাতের নেটওয়ার্ক বড়ডেইল, দরিয়ানগর, মিস্ত্রিপাড়া, জেটিঘাট, নোয়াপাড়া, সাবরাং, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া, কায়ুকখালী পাড়াঘাট, নাইত্যংপাড়া, বরইতলী, কেরুনতলী, শাহপরীর দ্বীপ, নাফ নদীর খুরের মুখ, ঘোলারপাড়া, দক্ষিণপাড়া, মাঝেরপাড়া সৈকত, সাবরাং কচুবনিয়া, হারিয়াখালী, কাটাবনিয়া, আলীরডেইল, মুন্ডারডেইল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেষখালীয়াপাড়া সৈকত, নোয়াখালীপাড়া, কুনকারপাড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর, শীলখালী, মাথাভাঙ্গা, উখিয়ার থাইংখালী, পালংখালী, বালুখালী, রেজুপাড়া, তমব্রু, আছাড়তলী ও ঢালারমুখসহ বিভিন্ন পয়েন্টে তত্পর আছে।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইয়াবা ব্যবসার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মারামারি ও সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় গত ৬ মাসে ১০ জন রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধশত। ক্যাম্পে অবস্থানরত অনেক রোহিঙ্গা নাগরিক হাকিম ডাকাতের নেটওয়ার্কের অধীন। মিয়ানমার থেকে বিনা মূল্যে ইয়াবার চালান তাদের কাছে পাঠানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে সেই চালান পৌঁছে যায় টেকনাফের নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে। যে চালান নিরাপদে ব্যক্তিবিশেষের কাছে পৌঁছাবে কেবল তারই মূল্য পরিশোধ করতে হয়। হুন্ডির মাধ্যমে ঐ টাকা পাঠানো হয়।

উল্লেখ্য, গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফের ১ হাজার ১৫১ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। তার মধ্যে ৭৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারি বা পৃষ্ঠপোষকের নাম আছে। তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি মেম্বার ও হাকিম ডাকাতের নেটওয়ার্কের সদস্যদের নাম রয়েছে।