বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল

এই মহাবীর-এর জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭ সালে, ভোলা জেলার দৌলতখান থানার পশ্চিমহাজীপুর গ্রামে। পিতার নাম হাবিবুর রহমান, মাতা মোছা.মালেকা বেগম। পিতা সেনাবাহিনীর হাবিলদার ছিলেন। গ্রামের মানুষ তাঁকে হাবিব মিলিটারি বলে সম্বোধন করত। মোস্তফা কামাল ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটে ছিলেন। সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াতেন।

তাঁর ছেলেবেলা অনেকটা কুমিল্ল­া সেনানিবাসে পিতার সাথে কেটেছে। গ্রামের আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রায়ই সেনাবাহিনীর কোনও না কোনও ইউনিট প্রশিক্ষণের জন্য আসত। শারীরিকচর্চা ও বিভিন্ন কলাকৌশল প্রদর্শন করত তারা। গ্রামের লোকজন চেয়ে চেয়ে দেখত। এর মধ্যে এই দুরন্ত ছেলেটির মনে সেনা বাহিনীতে ঢুকার স্বপ্ন জাগ্রত হয়। কিন্তু পিতা হাবিবুর রহমান একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে ছেলের সেনাবাহিনীতে প্রবেশের ইচ্ছা সমর্থন করতেন না। তিনি চান ছেলে লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হোক, নাম-যশ হোক। সেই স্বপ্নে তিনি ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কোথায় কী,বাউণ্ডুলে ছেলে একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজি করেও তার হদিস মেলে না। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঠিক তাঁর জন্মের দিনটিতে মোস্তফা কামাল  ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন ।

সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। মা-বাবা ছেলে ফিরে পেয়ে বিরাট অস্বস্তি থেকে মুক্তি পান। কিন্তু বাবা খুব হতাশ হলেন, যেটি তিনি চাইছিলেন না, ছেলে সৈনিক হোক, সেটাই ছেলে করে এসেছে। কিন্তু ছেলে তো নাছোড়বান্দা। বাবা-মা’র নিষেধ মানবে কেন।

দুইবছর কঠোর অনুশীলনের পর কুমিল্ল­ায় পোস্টিং হলো, চার নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ডেল্টা কোম্পানিতে। তিনি ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হন। তখন তিনি পেয়ারা বেগম নামে খুব সুন্দরী একটা গ্রাম্য মেয়েকে বিয়ে করেন। তাঁদের একটা পুত্র সন্তানও জন্মেছিল।

১৯৬৭ থেকে ৬৯ এবং ১৯৭১, দেশের পরিস্থিতি দ্রুত মোড় নিতে থাকে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মোস্তফা কামালও ভিতরে ভিতরে এই আন্দোলনের প্রতি একাত্ম হতে থাকেন এবং ক্ষোভে ফুঁসতে থাকেন। এর মধ্যে কয়েক মাস পূর্বে নির্বাচনি কাজের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে মোস্তফা কামালের ডেল্টা কোম্পানিকে হবিগঞ্জ পাঠানো হয়। নির্বাচন শেষেও তাঁদেরকে সেখানেই রেখে দেয়া হয়।

এরপর ৭১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে সেই কোম্পানির সাথে মোস্তফা কামালও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলে আসেন মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এর আগেই তর্জনী উঁচিয়ে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ ঘোষণা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনা সদস্যরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ২৭ মার্চ সকালে মেজর শাফায়াত জামিল বাঙালি অফিসারদের সহযোগিতা নিয়ে রেজিমেন্টের অবাঙালি অধিনায়ক লে. কর্নেল খিজির হায়াত খানসহ সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সৈনিকদের নিরস্ত্র করে বন্দি করে ফেলেন। সিলেটের শমসেরনগর থেকে মেজর খালেদ মোশাররফ আর একটি কোম্পানি নিয়ে তাঁদের সাথে যোগ দেন। যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারপাশ ঘিরে এন্ডারসন খালের পাড়ে তিনটি প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরি করেন। একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে, অন্য দুটি আশুগঞ্জ ও উজানীস্বরে। আশুগঞ্জ ঘাঁটিতে দুই কোম্পানি ও অন্য দুটিতে এক কোম্পানি করে সৈন্য। সিপাহী মোস্তফা কামালকে তাঁর নৈপুণ্য ও কর্মতত্পরতার জন্য মেজর শাফায়াত জামিল মৌখিকভাবে ল্যান্স নায়েক এর দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং দরুইনে ২ নং প­াটুনে  ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার নিযুক্ত করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত অবস্থান পাকবাহিনিকে ভাবনায় ফেলে দেয়। তাঁরা ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ হেলিকপ্টার, গানশিপ, ন্যাভালগান বোট, এফ-৮৬ বম্বারসহপূর্ণ যুদ্ধশক্তিতে আশুগঞ্জ ও এন্ডারসন পাড়ে আক্রমণ করে। মুক্তিসেনারাও প্রস্তুত। তাঁরা প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। সেই অবস্থায় কোনও প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতেই মুক্তিসেনাদের জন্য খাবার পাঠানোর বন্দোবস্ত করা যায়নি। সব জায়গায়ই সৈন্যরা দুইদিন না খেয়ে লড়াই করে। খাবারের মধ্যে শুধুই পানি।

১৬ এপ্রিল পাকবাহিনী কুমিল্ল­া আখাউড়া রেললাইন ধরে অগ্রসর হতে থাকে। তাদের লক্ষ ৪নং ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। ১৭ এপ্রিল ২ নং প­াটুনের ওপর তারা গোলা বর্ষণ শুরু করে। মেজর শাফায়াত জামিল হাবিলদার মুনির আহমদকে দিয়ে ডি কোম্পানির ১১ নং প্ল­াটুন ও প্রচুর গুলি দিয়ে পাঠিয়ে দেন ২ নং প্ল­াটুনকে সহযোগিতা করার জন্য। এদিকে পাকবাহিনীর গোলাবর্ষণ বাড়তেই থাকে। মর্টার ও আর্টিলারি গোলা বর্ষণ করে তারা আক্রমণ শানাতে থাকে।

                পরের অংশ আগামীকাল