করোনাকালে এবারের শীতকালীন কৃষি

আমরা অত্যন্ত আনন্দ ও সাফল্যের সঙ্গে লক্ষ করছি যে প্রায় বছরকাল ধরে চলমান করোনা মহামারিকালেও বাংলাদেশের কৃষি তার সব খাত-উপখাতেই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে চলেছে। গত বছর, অর্থাত্ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়ে তা এখন ‘কোভিড-১৯’। এরই মধ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বর সমাগত। সেই হিসাবে কোভিড-১৯-এর রাজত্বের প্রায় এক বছর হতে চলেছে। বিগত এক বছরের দাপট দেখিয়ে সব পূর্বাভাস, পরিকল্পনা ও ধারণা মিথ্যা প্রমাণীত করে দিয়ে আবারও বেড়ে চলেছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার। বিশেষজ্ঞগণ এটিকেই সেকেন্ড ওয়েব বা দ্বিতীয় ঢেউ বলে বেশ আগে থেকেই আশঙ্কা করে আসছিলেন। সর্বশেষ পরিসংখ্যানমতে, প্রথম আক্রমণে সারা বিশ্বে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড গড়েছে সর্বক্ষেত্রেই। এরই মধ্যে আমাদের দেশেও আক্রান্ত ও মৃত্যু একবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে নিম্নগামী হয়ে তা শীতকাল বিবেচনায় আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

তবে একটি বিষয় বলা যায়, করোনা শুধু যে আমাদের জন্য ক্ষতিই এনেছে তা নয়, এ থেকে আমরা নতুন অনেক কিছু শিখতেও পেরেছি। সেটাও তো কম কথা নয়। করোনাকালে বাংলাদেশের কৃষির সব পর্যায়ে অভিযোজনের শিক্ষা লাভ করা অন্যতম প্রাপ্তি। আমরা দেখেছি, করোনার প্রথম ওয়েবে সারা বিশ্ব এবং বিশ্বের সবকিছুই যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের কৃষি দেখিয়েছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। কৃষির উত্পাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ সচল রেখে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তাই করোনার আক্রমণ যত তীব্রই হোক না কেন, বাংলাদেশের কৃষিকে এভাবেই সমুন্নত রেখে চালিয়ে নিতে হবে। যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়টি এখন অনেকটাই দৃশ্যমান, সেজন্য আগে থেকেই কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছে। কারণ আগে ধারণা না থাকার পরেও যেহেতু গত বছর কৃষি উত্পাদন ও সরবরাহব্যবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক রাখা গেছে। কাজেই এ বছরও গত বছর থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল ও কার্যকরের মাধ্যমে সফলকাম হওয়ার পথে।

আমাদের দেশের কৃষিতে গত বছর বিশেষ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করার ফলে সেখানে সফলতা এসেছে। সেই ধারা অব্যাহত রাখার ফলে এবং গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৃষিবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে এবারও সফলতা আসছে। করোনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসব সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণোদনা ঘোষণা করেছিলেন। সেই প্রণোদনা কৃষির ক্ষেত্রে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। ভালো মানসম্পন্ন বীজ আমদানি, উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণে প্রণোদনা, ধান চাষ ও মাড়াই, বৃক্ষরোপণ, মাছচাষ, গবাদিপশু, হাঁসমুরগি ইত্যাদি প্রতিপালনের জন্য প্রণোদনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য প্রণোদনা, সারের ক্ষেত্রে প্রণোদনা ইত্যাদি ছিল গত বছরের কৃষিক্ষেত্রে সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।

কৃষি বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ চেইন উন্নতকরণের মাধ্যমে সবার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা মিটিয়ে ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে বাজারমূল্য সবার নাগালের মধ্যে রাখতে সহযোগিতা করেছে। তখন লকডাউন পরিস্থিতিতে এসব কাজ করা অতটা সহজ ছিল না। সেজন্য সরকারের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের অশেষ পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কৃষি উন্নয়ন স্বাভাবিক রাখতে মন্ত্রী, সচিব, ডিজি মহোদয়গণসহ মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ জীবনও দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অগ্রগণ্য। সে সময় চালু রাখতে হয়েছে পরিবহনব্যবস্থা। কাজ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বাংলার আপামর কোটি কোটি কৃষককুল, হাজার হাজার কৃষিবিদ ও কৃষিকর্মী।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবারও এই শীতকালে বাংলাদেশ নিমজ্জিত হচ্ছে। কাজেই আগের সব কাজের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে ইতিমধ্যে। পাশাপাশি নতুন নতুন আরো উন্নত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সামনে এগোনোর পথ খোঁজা হচ্ছে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় শীতকালটা কৃষির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মৌসুমে দুটি বড় ধান ফসল হয়ে থাকে। তার একটি আমন, যা মাড়াই করা হচ্ছে। দেখা গেছে, এবারও আমনে বাম্পার ছলন হয়েছে। অন্যটি হলো বোরো ফসল, যা আবার ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। তাছাড়া এই শীতকালেই আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ অনেক মজাদার, পুষ্টিকর, গুরুত্বপূর্ণ ও সাশ্রয়ী শীতকালীন ফসল ও শাকসবজি উত্পাদন হয়ে থাকে। অন্যদিকে ডিম উত্পাদন, মাছ উপাদন, মাংসের জন্য গবাদিপশু ও হাঁসমুরগি উত্পাদনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময় এই শুষ্ক মৌসুম। তাছাড়া উত্পাদিত এসব কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, রপ্তানি ও পরিবহনের উপযুক্ত সময়ও শীতকাল।

কাজেই কৃষিক্ষেত্রে করোনা প্রাদুর্ভাবের দ্বিতীয় ঢেউকে মোকাবিলা করার জন্য সেসব বিষয় মাথায় নিয়েই ব্যবস্থা নিতে হবে। তাতে খাদ্য ঘাটতিজনিত হাহাকার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, উপরন্তু আমরা খাদ্য উদ্বৃত্ব দেশ হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করে শুধু আয় করা নয়, আমরা করোনাকালে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়াতে পারি। আর সেটি করার জন্য আমাদের সঠিকভাবে কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করতে হবে। গত কিছুদিন আগেও পেঁয়াজ ও আলুর মূল্য নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছিল দেশের মানুষ। ইতিমধ্যে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ফসল ওঠার কারণে সেগুলোর মূল্য মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। ধান-চাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও প্রাপ্তি সবই সঠিক পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এখন করোনাকে বাংলাদেশের মানুষ আর অতটা ভয় করে সব উন্নয়ন ছেড়ে দিয়ে বসে নেই। বরং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে যার দায়িত্বে অবদান রেখে দেশকে এবং দেশের মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। আর এভাবেই সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।

n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়