ধর্ষণ মামলার রায়ের প্রজ্ঞাপন প্রকাশেই বছর পার!

প্রায় দেড় বছর আগে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট। রায়ের ঐ নির্দেশনাসূমহ প্রতিপালন করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের ঐ নির্দেশনা অবিলম্বে নিম্ন আদালতের বিচারকদের অবহিত করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছিল। সেই হিসাবে পূর্ণাঙ্গ রায় দ্রুত প্রকাশ করে হাইকোর্ট। কিন্তু দ্রুত রায় প্রকাশ পেলেও নিম্ন আদালতের বিচারকদের তা অবহিত করতে লেগে যাচ্ছে এক বছরের বেশি সময়।

কেন এই বিলম্ব, সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি হাইকোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমান। তবে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের           অনুলিপি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। সেখান থেকে রায়ের নির্দেশনাসমূহ অধস্তন আদালতের বিচারকেরা পেয়ে থাকেন। উচ্চ আদালতের রায়ের নির্দেশনাসমূহ অধস্তন আদালতের বিচারকদের মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনে সরকার। ঐ সংশোধনীতে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। তখন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হবে, তিনি যেন একটি প্র্যাকটিস ডাইরেকশন দেন, যাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিচারকগণ যথাযথ পদক্ষেপ নেন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালন করা হলে নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচারে গতি পাবে।

প্রসঙ্গত, ‘মো. রাহেল ওরফে রায়হান বনাম রাষ্ট্র’ ও ‘মো. সেকান্দার আলী বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চের দেওয়া রায়ের নির্দেশনায় ধর্ষণ মামলার বিচার আইনে বেঁধে দেওয়া ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা, মুলতবি ছাড়া মামলার শুনানি গ্রহণ, ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে মনিটরিং কমিটি গঠন, সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করা, সমন পাওয়ার পর অফিসিয়াল সাক্ষী (ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ) সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য প্রদানে হাজির না হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বেতন বন্ধের আদেশ দিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের বলা হয়। গত বছরের ১৮ জুলাই হাইকোর্ট এ রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে বিচারাধীন মামলাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে এসব নির্দেশনা দেওয়া হলো। রায়ের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদেশের কপি স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠানো হোক।

কিন্তু ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই এ রায় হলেও চলতি বছরের ২৫ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর। এতে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাসংক্রান্ত মামলাসমূহ বিদ্যমান আইনের অধীন দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্ট কতিপয় নির্দেশনা প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধস্তন আদালতের সকল পর্যায়ের বিচারকদের বলা হলো।

এ প্রসঙ্গে আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস (ডিএলআর)-এর সম্পাদক ও দুদকের প্রধান কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, রায় প্রকাশের এক বছরের বেশি সময় পর কেন প্রজ্ঞাপন করা হলো বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। এ ঘটনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের লাল ফিতা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আমি মনে করি, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই এর সুফল পাবে বিচারপ্রার্থী জনগণ।