g শফিকুর রহমান রয়েল
বিশ্ব মিডিয়ায় প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছে মিসর। আরব-বসন্তের ছোঁয়ায় হোসনি মুবারকের পতন, অতঃপর মোহাম্মদ মুরসি হলেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এতে ধারণা জন্মেছিল, এবার সামনে এগোবে মিসর। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই সেনা সহায়তায় বসল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নির্বাচনে আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসি হলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু যে জিনিসটি বিস্ময় জাগিয়েছিল, সেটি হলো— সাবেক ফিল্ড মার্শাল আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে তার সমর্থকরা পরবর্তী জামাল আব্দেল নাসের ভাবতে শুরু করেছিলেন। অনুগতদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তিনি নাসেরের মতোই চমক দেখাবেন অর্থনীতিতে। তিনি হড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন মিসরকে টেনে তোলার কাজটা মোটেই সহজ নয়।
সমস্যা হচ্ছে- মিসরের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা দেশের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অর্থনীতি দিয়ে কোনো আলোচনাই করছেন না। তারা আলোচনা করছেন ওইসব বিষয় নিয়ে— দেশ হবে সিভিল, ধর্মীয় না সামরিক। পরিচালনা করবে কে, মুসলিম ব্রাদারহুড নাকি সামরিক সমর্থনপুষ্ট সরকার। কিন্তু তারা যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তা হলো, অর্থনীতিতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন দেখাতে না পারলে গত আট বছরে যে ধরনের বিপ্লবগুলোর মুখোমুখি হয়েছে সেগুলোর চেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব মোকাবিলা করা লাগতে পারে ভবিষ্যতে। আগের সরকারগুলো সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কিছুই করা হয়নি। কিছুদিন আগে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও তাতে সকল পেশাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া যে পরিমাণ বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মিসরীয়দের হাহুতাশ ছাড়া কিছুই করার নেই।
প্রেসিডেন্ট সিসি ঠিকই বুঝতে পারছেন যে, মিসরের সমস্যাটা খুবই সাধারণ; কিন্তু সমাধান করাটা খুবই কঠিন। আয়ের তুলনায় রাষ্ট্রের ব্যয় অনেক বেশি। চলতি অর্থবছরে দেশের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা কি-না গত অর্থবছরের জিডিপির ১৪ শতাংশের সমান। বস্তুত ৬ মিলিয়নেরও বেশি সরকারি কর্মচারীকে টানতে গিয়েই মিসরের অবস্থা কাহিল। সংখ্যাটা খুব শীঘ্রই সাত মিলিয়নে পৌঁছুবে। কারণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক অস্থায়ী কর্মচারীকে স্থায়ী করা হয়েছে এবং হচ্ছেও। ৭৫ হাজার অস্থায়ী শিক্ষককে দেওয়া হয়েছে স্থায়ী চুক্তির প্রস্তাব। তাছাড়া অনেক দামি পণ্যেই সরকার ভর্তুকি দেয়। তেলের ভর্তুকির পেছনে সরকারের গত অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ১৪০ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বস্তুত ফ্রি মার্কেট ইকোনোমি ও কমান্ড ইকোনামি’র মধ্যখানে আটকা পড়ে খাবি খাচ্ছে মিসর। খুঁজে পাচ্ছে না এ অবস্থা থেকে বের হবার রাস্তা।
মুবারকের আমলে ইস্যুগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল সত্য; কিন্তু খুব বেশি এগোনো সম্ভব হয়নি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে। বিশ্বমন্দা তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে মিসরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ, কিন্তু দেশের এক-তৃতীয়াংশ লোক ঠিকই বাস করছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছিল না প্রবৃদ্ধির সুফল। একই অবস্থা এখনো রয়ে গেছে। উপরন্তু অনেক নেমে এসেছে প্রবৃদ্ধির হার। গত বছর প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর তা আরো কমে যেতে পারে। ২০০৯ সালে বেকারত্বের হার ছিল যেখানে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, সে জায়গায় গত বছর তা পৌঁছায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশে। সমালোচকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সিসি যদি নিজের গদির নিরাপত্তার পেছনেই অর্থ ও সময় বেশি ব্যয় করেছেন, যে কারণে ভেস্তে যাচ্ছে তার অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনের স্বপ্ন। সত্যিকার অর্থেই মিসরের প্রয়োজন এখন অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ, যার সুফল সবাই পেতে পারে।
—দ্য ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল অনুসরণে