১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে বাঙালি জাতি যখন স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের স্বপ্নে বিভোর, তখনই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের সাহায্যে বাঙালির কৃতী সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঢাকার রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে বড় অসহায় অবস্থায় নিঃশেষে প্রাণ দেন আমাদের সেরা শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিত্সক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীগণ। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে অপারেশন সার্চলাইটের সময় হইতে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হইলেও শেষের দিকে তাহারা আরো বেপরোয়া ও হিংস্র হইয়া উঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে বীর বাঙালির হস্তে নাস্তানাবুদ হইয়া শেষে জাতিকে মেধাশূন্য করিবার সুদূরপ্রসারী ও ঘৃণ্য নীলনকশা বাস্তবায়নে তাহারা হইয়া উঠে আরো মরিয়া। তাহারা চাহিয়াছিল বাঙালি জাতি যাহাতে মেরুদণ্ড সোজা করিয়া দাঁড়াইতে না পারে। শ্বাপদীয় জন্তুর মতো ঘাতকরা বিজয় দিবসের কয়েক দিন পূর্বেই ঢাকা ও ঢাকার বাহিরের বিভিন্ন অঞ্চলে বুদ্ধিজীবীদের বাসা হইতে ধরিয়া আনিয়া নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ঘাতকরা বুদ্ধিজীবীদের নিজ নিজ বাড়ি হইতে গেস্টাপো কায়দায় তুলিয়া লইয়া কালো কাপড়ে চোখ বাঁধিয়া বিশেষ নির্যাতনকেন্দ্রে লইয়া আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেয়নেটের আঘাতে তাহাদের দেহ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বিশ্ব-ইতিহাসে এক জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড হিসাবে বিবেচিত।
নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাহাদের দোসরদের হাতে ১০ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পাঁচ জন বিশিষ্ট সাংবাদিক, দুই জন প্রভাষক ও ২৬ জন চিকিত্সক অকাতরে প্রাণ হারাইয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও শেষ মুহূর্তে আসিয়া যেই সকল বুদ্ধিজীবী শহিদ হন, তাহাদের সংখ্যা আরো অধিক। দুঃখজনক হইল, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বত্সর পরও আমরা শহিদ বুদ্ধিজীবীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন এবং তাহাদের পরিচিতি তুলিয়া ধরিতে পারি নাই। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পিছনে প্রধানত দায়ী করা হয় আলবদর বাহিনীকে, যাহার সদস্যরা ছিল এই দেশীয় ও তথাকথিত একশ্রেণির ইসলামপন্থি। আলবদরের তত্ত্বাবধানে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত তত্কালীন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি এবং তাহাকে সাহায্য করেন সিভিল আর্মড ফোর্সের উচ্চপদস্থ অফিসার জেনারেল জামসেদ। ফরমান আলি তত্কালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, ফজল মুকিম খান ও টিক্কা খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যদিও ‘হাও পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ গ্রন্থে ফরমান আলি বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকিবার কথা অস্বীকার করিয়াছেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাহার লেখা ‘ডায়রি’ হইতে এসব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
দেরিতে হইলেও বাংলার মাটিতে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ বিচার হইয়াছে এদেশীয় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের। ইহাতে জাতি অনেকটা কলঙ্কমুক্ত হইয়াছে। শহিদ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন সত্যের পথে অবিচল ও প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃত অর্থে তাহারা দেশকে এবং এই দেশের মানুষকে ভালোবাসিতেন। তাই তাহাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাইতে পারে না। তাহাদের ত্যাগই আজ সমৃদ্ধ করিতেছে নূতন প্রজন্মকে। যেই জাতিকে পাকিস্তানি হানাদাররা মেধাশূন্য করিতে চাহিয়াছিল, সেই জাতি আজ বুক উঁচু করিয়া বিশ্ব দরবারে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। আর্থসামাজিকসহ বিভিন্ন উন্নয়নের ক্ষেত্রে আজ আমরা পাকিস্তানকেও ছাড়াইয়া গিয়াছি। এখন আমাদের উচিত শহিদ বুদ্ধিজীবীদের আদর্শ ও স্বপ্নকে আরো সামনে আগাইয়া লওয়া; দেশের টিকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য মেধাসম্পদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং তাহার সঠিক পরিচর্যা করা। তাহাদের চেতনাকে বুকে ধারণ করিয়াই সমস্ত অপশক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব। আজিকার এই শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মহান শহিদ বুদ্ধিজীবীসহ একাত্তরের সকল শহিদের প্রতি জানাই বিনম্ব শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।