মহামারি নিয়ন্ত্রণে টিকা

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানবজীবনের ক্লান্ত আঙিনায় মহামারির মতো অচেনা সংকট বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। আর একুশ শতকে এসে মহামারি নভেল করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে আলতামাখা তরঙ্গের হাত ধরে বিশ্ববাতাসে শবেদের শব্দে বয়ে যাচ্ছে নোনাজলের সাহসী রাগ। মানুষও পিছিয়ে নেই, আহত অবয়বের আলোয় ভাঙাচোরা পৃথিবীর বুকে ফুটিয়ে তুলেছে প্রতিষেধক বা টিকার ছন্দময় বিন্যাস। যে বিন্যাসী অন্তরীক্ষে টিকা বা ভ্যাকসিন হিসেবে আমরা দেখা পাই একধরনের জৈব রাসায়নিক যৌগের; যা অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে উত্তেজিত করে প্রাণিদেহে কোনো একটি রোগের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মাতে সাহায্য করে। আর তাই প্রতিটি মহামারিতে বিশ্বজুড়ে টিকা অর্থাত্ প্রতিষেধকের নামে তীর্যক নিবাসের আক্ষরিক আশ্রয়ের কথা উঠে এসেছে উড়ন্ত শব্দের ব্যস্ত শত অন্তমিলে। কারণ টিকা দেওয়া হলে প্রাণিদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সাধারণ জীবাণু সংক্রমণের মতো কাজ করে অর্থাত্ টিকা জীবাণুকে অচেনা বা বিদেশি বস্তু বা অ্যান্টিজেন হিসেবে চিহ্নিত করে। শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি করে টিকার ক্ষেত্রেও সেই একইভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে ইমিউনিটি বা রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে যে জৈব-রাসায়নিক মিশ্রণ তাকে ভ্যাকসিন বা টিকা বলে। এ প্রতিষেধক জৈব পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। সেক্ষেত্রে খুব সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি, টিকা হচ্ছে কোনো প্রাণীর দেহে রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস (Virus), ব্যাক্টেরিয়া (Bacteria) ইত্যাদির জীবিত (যার রোগসূচনাকারী ক্ষমতা শূন্য) বা মৃতদেহ বা কোনো অংশবিশেষ হতে প্রস্তুত ওষুধ যা প্রাণীটির দেহে ঐ ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে আন্টিবডি সৃষ্টি করে। টিকা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শিখিয়ে দেয় কীভাবে দ্রুত নির্দিষ্ট জীবাণুটিকে ধ্বংস করতে হয়। এতে অসুস্থ হতে হয় না। ফলে দেহে সংক্রামক রোগের জীবাণু ঢোকার আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রস্তুত হয়ে থাকে লড়াই করার জন্য। হারানোর পদ্ধতিটিও চেনা থাকে বলে সহজেই জিতে যায়। 

যত দূর জানা যায়, ১০ম শতাব্দীতে চীনে ‘ভ্যারিওলেশন’ নামে এক চীনা চিকিত্সা পদ্ধতি ছিল যেখানে অসুস্থ রোগীর দেহ থেকে টিস্যু নিয়ে তা সুস্থ মানুষের দেহে বসিয়ে দেয়া হতো। অনেকটা সেখান থেকেই বলা চলে টিকার ধারণা তৈরি হয়। এর প্রায় আট শতাব্দী পরে অর্থাত্ ১৭৯৬ সালে ব্রিটিশ ডাক্তার অ্যাডওয়ার্ড জেনার গরুর বসন্ত এবং গুটিবসন্তের বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা করেন। তার এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১৭৯৮ সালে। আর তখনই প্রথমবারের মতো সমগ্র বিশ্ব ‘ভ্যাকসিন’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়। যা কি না ল্যাটিন শব্দ ‘ভ্যাক্স’ থেকে এসেছে, ‘ভ্যাক্সা’ অর্থ গরু। আর এই আবিষ্কারের মাধ্যমেই খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৫৭০ অব্দ থেকে শুরু হওয়া মহামারি গুটিবসন্ত ১৯৮০ সালে এসে মানুষের অভিলাষী বোধনের অঙ্কুশে বিদ্ধ হয়। যে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে আঠার শতকে প্রতি বছর শুধু ইউরোপেই ৪ লাখ লোক মারা যায় সেই ভয়ঙ্কর মহামারিটির নিথর হয়ে অনন্তের গভীরে লুটিয়ে পড়ার ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। নির্মূল হয় প্রাণঘাতী গুটিবসন্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, পৃথিবীতে বর্তমানে বিভিন্ন রোগের প্রতিরোধক হিসেবে প্রায় ২৫টি রোগের টিকা চালু রয়েছে এবং টিকা দানের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ২০ থেকে ৩০ লাখ শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। সেই সঙ্গে টিকা প্রয়োগ করে প্রতি বছর প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি এটাই যে, মহামারিমুক্ত তৃষ্ণার্ত বিশ্বের খোঁজে ছুটে চলা এই টিকার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি রোগকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে; যার একটি গুটিবসন্ত, অন্যটি রাইন্ডারপেস্ট (গবাদিপশুর বিশেষ রোগ)। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী অন্তত ১০ বছর বিশ্বের কোথাও একটি রোগের দেখা পাওয়া না গেলে সেটি ‘নির্মূল’ হয়েছে বলে ধরা হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রোগটির জীবাণুর উত্স (রিজার্ভার) কেবল গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত থাকা ছাড়া এর অস্তিত্ব পৃথিবীর কোথাও থাকতে পারবে না, এমনটি উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছয়টি মহাদেশীয় অঞ্চলের চারটিতে ১০ বছর যাবত্ কোনো একটি রোগে কেউ আক্রান্ত না হলে রোগটি ‘দূর হয়েছে’ বলে ধরা হয়। বিশ্বের এক অঞ্চলে এ রোগের অস্তিত্ব না থাকলেও অন্য অঞ্চলে থাকতে পারে। অন্যদিকে টিকার মাধ্যমে একটি রোগকে কোনো অঞ্চল থেকে নির্মূল বা দূর করা সম্ভব না হলেও যদি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় তবে তাকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা বলে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে টিকা উদ্ভাবনের একরকম বিস্ফোরণ ঘটে। হুপিং কাশি, ডিফথেরিয়া, টিটেনাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও মামসের বিভীষিকা থেকে রক্ষা পায় মানুষ। এছাড়া বিজ্ঞানীদের নিরলস শ্রমে কলেরা, প্লেগ, অ্যানথ্র্যাক্স, হাম, রুবেলা, হেপাটাইটিস এ এবং বি, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, পোলিও, জলাতঙ্ক ইত্যাদি রোগের টিকা যেমন আবিষ্কৃত হয়েছে তেমনি সার্স, মার্স বা এইডসের মতো ঘাতক ব্যাধির টিকা এখনো বলা চলে অনেকটা অধরাই রয়ে গেছে। জিকা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রায় ৭০ বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হলেও এখনো এর টিকা উত্পাদন করা সম্ভব হয়নি। এমন অনেক রোগের টিকার আশায় যখন বিশ্ববাসী তখন বিশ্ববাসীর চাওয়ার পেয়ালায় যোগ হয়েছে কোভিড-১৯ থেকে মুক্তির প্রত্যাশা।

ইতিমধ্যে বিশ্ববাসী কোভিড ১৯-এর তাণ্ডবতার ঝাঁঝালো নৃত্যের সমাপনী টানতে যাচ্ছে টিকা প্রাপ্তির মাধ্যমে। তবে যুগে যুগে এই টিকা প্রয়োগ এবং এর সফলতার পাশাপাশি ভোগান্তির আশঙ্কারও কমতি ঘটেনি; যা আমরা পোলিওর টিকার ক্ষেত্রে দেখেছি। আর যেহেতু শিশু থেকে বৃদ্ধ, ধনী থেকে গরিব সর্বস্তরের জনগণের জীবন রক্ষার পাশাপাশি সাশ্রয়ী চিকিত্সা সরবরাহের ব্যবস্থা হচ্ছে টিকা। তাই ভেজাবালির ঘ্রাণেও রুপালি গোলাপের মতো আমাদের তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে কোভিড ১৯-এর টিকার অপেক্ষায়। কিন্তু প্রতিটি কার্যক্রমের ন্যায় একটি টিকা কর্মসূচিরও সুষ্পষ্ট প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ব্যয় রয়েছে। টিকা কেনা এবং কর্মসূচিটি পরিচালনার জন্য অবকাঠামোগত, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক, সরবরাহব্যবস্থাসহ সবকিছুর জন্য খরচের যোগসূত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আশার কথা হচ্ছে, প্রতিটি দেশের সরকার এবং কিছু দাতব্য সংস্থার সমন্বয়ে এই অর্থায়নের জোগান কখনো থেমে থাকেনি, থেমে নেইও। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশ ইতিমধ্যে কোভিড ১৯-এর টিকা ক্রয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট তত্পরতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও নারীনেত্রী