কক্সবাজারের টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ অস্ত্র ও ইয়াবা ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। সেই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে চলত অমানুষিক নির্যাতন। আর ওসি প্রদীপ দাশের অস্ত্র ও ইয়াবা বাণিজ্যের কথা জেনে যান মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। তাই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত?্যা করা হয়। এই হত্যার পরিকল্পনাটি করা হয় থানায় বসেই। গতকাল রবিবার কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিনহা হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে র?্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে র্যাবের লিগ?্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, হত্যার পর ঐ সময়ের পুলিশ সুপার যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি। তাই চার্জশিটে কক্সবাজারের তত্কালীন পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন এ বিষয়ে নির্লিপ্ত ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ভার র্যাব পাওয়ার চার মাস ১০ দিন পর তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছেন। ৮৩ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করে ২৬ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জ গঠন করেছেন। এই ১৫ আসামির মধ্যে ৯ জন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্য, তিন জন এপিবিএন এর বরখাস্ত হওয়া সদস্য এবং তিন জন বেসামরিক ব্যক্তি।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ে মেজর (অব.) সিনহা ওসি প্রদীপের বক্তব্য নিতে চান। প্রদীপ এ নিয়ে সিনহাকে হুমকি দেন। পরে তাকে হত্যা করেন। ইউটিউব চ্যানেল ‘জাস্ট গো’ এর জন্য সিনহা ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র ধারণ করছিলেন পাহাড়ে। তথ্যচিত্রের ব্যাপারে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। কথাবার্তা চলাকালেই ইয়াবা কারবারে প্রদীপের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পান সিনহা। একই সঙ্গে প্রদীপের বহুমুখী নির্যাতনের তথ্যও পান তিনি। এ নিয়ে টেকনাফ থানাতেই সিনহাকে হুমকি দেন প্রদীপ ।
সিনহা সামান্য কদিনেই প্রদীপের ত্রাসের রাজত্বের সন্ধান পেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন তা জানত না—এটা ব্যর্থতা কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে র?্যাবের দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ তা তারা মনে করে না।
র?্যাবের ঐ কর্মকর্তা আরো বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা খুব স্পষ্টভাবেই একটি বিষয় সামনে এনেছেন। ঘটনার সাক্ষী, আলামত, আসামিদের জবানবন্দির মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠভাবে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী টেকনাফ থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ।
আশিক বিল্লাহ আরো বলেন, মেজর (অব.) সিনহা, সিফাত ও শিপ্রা কক্সবাজার ও টেকনাফে যে ধরনের ডিজিটাল কন্টেন্ট সংগ্রহ করেছিল, তার পুরোটাই প্রথমে টেকনাফ থানাতে নেওয়া হয়েছিল। তদন্তের স্বার্থে পরবর্তী সময় এসব ডিজিটাল কন্টেন্ট আমরা গ্রহণ করি এবং আসামিদের বক্তব্য ও সিনহার সহযোগীদের বক্তব্যে র?্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন, যে ঐ ল্যাপটপের মধ্যে স্পর্শকাতর এমনকিছু ছিল, যার কারণে ওসি প্রদীপ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছিল। পরে ল্যাপটপের মধ্যে থাকা কন্টেন্ট উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এবং অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য প্রদীপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রদীপের প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেন অপর আসামি এসআই লিয়াকত আলী, মো. নুরুল আমিন, পুলিশের সোর্স মুহাম্মদ আয়াজ ও মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন। আবার লিয়াকত আলীকে সহযোগিতা করেন আরেক পুলিশ সদস্য নন্দ দুলাল। পাশাপাশি এপিবিএনের তিন সদস্যদের সহায়তায় এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরবর্তী সময় ঐ ফাঁড়ির আরো পুলিশ সদস্য সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করতে এবং ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।