কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। ওসি প্রদীপসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে গতকাল রবিবার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রতিবেদনটি দাখিল করেন র?্যাব-১৫-এর এএসপি মো. খায়রুল ইসলাম। অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে রয়েছেন। পলাতক রয়েছেন এক জন ।
দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় আলোচিত এই মামলার তদন্ত চলে। অভিযুক্তরা কয়েক দফা রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। শুধু ওসি প্রদীপ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।
চার্জশিট জমা দেওয়ার পর আদালত এলাকায় এএসপি মো. খায়রুল বলেন, সিনহা হত্যা মামলাটি আমরা নানাভাবে তদন্ত করেছি। তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলো সাজিয়ে চার্জশিট হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, হত্যার ঘটনা তদন্তকালে র্যাব এ ঘটনায় ১৫ জনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপসহ ১৪ জন কারাগারে। সাগর নামে ওসি প্রদীপের এক সহযোগীকে পলাতক দেখানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার, বাহারছড়া ক্যাম্পের পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, টেকনাফ থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছাড়াও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএনের তিন জন এবং স্থানীয় তিন জনসহ ১৪ জন মামলা নথিভুক্তের পর গ্রেফতার হন।
গত ৩ জুলাই ‘জাস্ট গো’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ট্রাভেল শো ডকুমেন্টারির শুটিংয়ের জন্য তিন জন সহযোগীসহ কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে ওঠেন মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ। এই খবর পৌঁছায় টেকনাফের তত্কালীন ওসি প্রদীপ কুমারের কাছে। তখন থেকেই ওসি প্রদীপ অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘ভিডিও পার্টিকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, যেকোনো মূল্যে।’ এরপর থেকেই সিনহাকে নজরদারিতে রাখেন পরিদর্শক লিয়াকত ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত।
৩১ জুলাই সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, সিনহা রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের দিকে আসার পথে বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আলোচনা হয় বিদেশেও।
এ ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তখনই তদন্তের স্বার্থে টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ সব পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্ধসহস্রাধিক পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
এদিকে, ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে, যিনি সিনহাকে গুলি করেছিলেন। টেকনাফ থানার ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয়েছে দুই নম্বর আসামি। এজাহারে বলা হয়েছে, গুলি করার আগে লিয়াকত তার সঙ্গে ফোনে পরামর্শ করেছিলেন। ওসির প্ররোচনা ও নির্দেশনাতেই লিয়াকত ঠান্ডা মাথায় সিনহাকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে প্রদীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সিনহার মুখমন্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে বিকৃত করার চেষ্টা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে টেকনাফ থানার এসআই দুলাল রক্ষিতকে, যিনি সিনহার মৃত্যুর পর মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন। এরপর অভিযুক্ত সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।