অবরুদ্ধ শহরে মাইকে যখন ঘোষণাটি শুনলেন শ্যামলাল আগরওয়াল, তখন মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা জীবনে যেন বেঁচে থাকার আলো দেখতে পেলেন। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সকালে সৈয়দপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমে চারটি বগি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি যেন বেঁচে যাওয়ার আনন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শ্যামলাল আগরওয়াল পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে মাটি ভরাটের কাজ করছিলেন।
পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে মাইকে দেওয়া সেই ঘোষণায় বলা হচ্ছিল, সৈয়দপুর শহরে যে কজন হিন্দু মাড়োয়ারি আটকা পড়ে আছেন, তাদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে ভারতের শিলিগুড়িতে যাবে।
ভারতের বিহার থেকে আসা উদ্বাস্তুদের প্রবল প্রতিপত্তি তখন সৈয়দপুর শহরে। সাধারণভাবে মানুষ বলে ‘বিহারি’। রাজাকার-আলবদরদের মতো মুক্তিযুদ্ধের সময় এদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সারা দেশে যখন মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণ শুরু হয়েছে, তখন সৈয়দপুর পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
অবরুদ্ধ হিন্দু, মাড়োয়ারিদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ১৩ জুন সকালে তাদের সৈয়দপুর রেলস্টেশনে একত্র করা হয়। এরপর স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গোলাহাট এলাকায় ঐ ট্রেন দাঁড় করায়। এরপর ট্রেনের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। ট্রেনের বগিতে আটকে থাকা অবস্থায় একেক করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের বের করে তলোয়ার ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। কোলের শিশুও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ঐ হত্যাকাণ্ডে ৪৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। কয়েক জন পালিয়ে নিজেদের রক্ষা করেন। তারাই ঐ নৃশংসতার সাক্ষী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই গণহত্যার নাম রেখেছিল ‘অপারেশন খরচাখাতা’। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তার ‘ট্রেন’ উপন্যাসে সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমি ও ট্রেন ট্র্যাজেডির নির্মম বর্ণনা তুলে ধরেছেন।
নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী গোলাহাট বদ্ধভূমির স্মৃতিস্তম্ভটি আজও পূর্ণতা পায়নি। নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড স্মরণ করতে ঐ স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। তবে এটির প্রাথমিক নির্মাণকাজ শেষ হলেও বেশ কিছু কাজ অসম্পূর্ণ। মাটি ভরাট, বাতি লাগানোসহ অন্যান্য কাজ অর্থাভাবে থমকে আছে। ‘অপারেশন খরচাখাতা’র দিনটিতে হিন্দু-মাড়োয়ারি ও রাজনৈতিক দলগুলো কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করলেও বাকি সময় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে বধ্যভূমিটি।
সেদিন বেঁচে যাওয়া তপন চন্দ্র দাস ওরফে কালঠু দাস বর্তমানে জরি-বুটির দোকান করেছেন সৈয়দপুর শহরের শহিদ ডা. জিকরুল হক সড়কে। তিনি জানান, ১৩ জুন সকালে পাকিস্তানি সেনাদের কথায় বিশ্বাস করে সরল বিশ্বাসে ট্রেনে উঠেছিলেন। কিন্তু শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পার হয়ে গোলাহাটে হঠাত্ থেমে যায় ট্রেনটি। বন্ধ জানালা একটু ফাঁক করতেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। বাইরে রাইফেল হাতে সারি সারি সেনা। সঙ্গে চকচকে রামদা হাতে তাদের দোসর বিহারিরা।
তপন চন্দ্র দাস আরো বলেন, থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই চিত্কার করে পাকিস্তানি সেনারা উর্দুতে বলতে থাকে, এক জন এক জন করে নেমে আসো। তোমাদের সবাইকে মেরে ফেলব, কিন্তু দামি গুলি খরচ করা হবে না। সবাইকে এক কোপে বলি দেওয়া হবে। তার পরই শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া সেই হত্যাযজ্ঞ। শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সবাইকে কোপাতে থাকে। বাইরে যাদের কোপানো হচ্ছিল, তাদের চিত্কার শুনে অনেকে ট্রেন থেকে নামতে চায় না। তখন ওরা ভেতরে ঢুকেও কোপ শুরু করে। তপন নিজে তখন একটি জানালা খুলতে পেরে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে বাঁচেন। অল্প যে কয়েক জন ভাগ্যবান সেদিন বাঁচতে পেরেছিলেন, তারা ভারতে চলে যান।