সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত: ঘাটাইলের মুক্তিযোদ্ধারা হতবাক ও ক্ষুব্ধ

দেশমাতৃকার টানে সাড়া দিয়ে জীবনকে বাজি রেখে ১৯৭১ সালে ঘাটাইল গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন মো. আব্দুল বাছেত করিম।  তিনি পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এলেঙ্গা-ভুয়াপুর রাস্তার নগরবাড়ি সেতুর নিকট সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। তিনি সর্বজন স্বীকৃত একজন প্রকৃত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ গত ৬ ডিসেম্বর তারিখে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) কর্তৃক ৫২জন মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও গেজেট বাতিল হচ্ছে শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঐ সংবাদে টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল বাছেত করিমের নাম থাকায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা হতবাক ও ক্ষুব্ধ। 

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আব্দুল বাছেত করিম ১৯৭১ সালে ঘাটাইল গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করন। মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুতির জন্য ঘাটাইল ঈদগাহ মাঠে আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম মোয়াজ্জেম হোসেন খানের নেতৃত্বে কিশোর ও তরুণ হিসাবে শহীদ কাজী আব্দুল হামিদ, মো. খসরু মিয়া (বীর প্রতীক), হেকমত বাঙ্গাল, মো. শাহাদৎ হোসন ও আব্দুল বাছেত করিম সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় তার ঘাটাইল দক্ষিণপাড়ার বসত বাড়িটি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার খোরশেদ আলম তালুকদার (বীর প্রতীক) এর  নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আব্দুল বাছেত করিম। ১৯৭১ সালে ১১ আগস্ট ভুয়াপুরের যমুনা নদীর ঐতিহাসিক মাটিকাটা নামক স্থানে বীরমুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানীদের সামরিক সরঞ্জাম ভর্তি জাহাজটি দখল করে প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ গোলাবারুদ উদ্ধার করে নেয়ার পর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আগ্রাসী আক্রমণ চালায়। এ সময় এলেঙ্গা-ভুয়াপুর রাস্তার নগরবাড়ি সেতুর নিকট তিনি ১২আগস্ট দিবাগত রাতে খোরশেদ আলম তালুকদারের (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে মো. বাছেত আব্দুল করিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্নক আহত হন। পরে তিনি পরিচয় গোপন রেখে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদ্দিনী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠিত হলে তিনি ঘাটাইল থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার পদে দীর্ঘকাল দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তার যুদ্ধাহত গেজেট নং ৬০৬, জাতীয় তালিকা নং ২৭৮,বাংলাদেশ গেজেট নং ৪৯৯৫, লাল মুক্তিবার্তা নং ০১১৮০৪০৪৪২। তিনি এ যাবৎকাল সকল প্রকার যাচাই-বাছাইয়ে প্রকৃত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি ও সনদ লাভ করেন।  

তার সহযোদ্ধা গৌরাঙ্গী গ্রামের মো. শাহাদৎ হোসেন ও লোকেরপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হায়দার আলী তালুকদার, ছয়ানি বকশিয়া গ্রামের আশরাফ আলী তালুকদার এবং রতনপুর গ্রামের নূরুল ইসলাম মন্টু বলেন, তার বিরুদ্ধে কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার গেজেট ও সনদ বাতিলের পায়তারা করা হচ্ছে? তা আমাদের বোধগম্য নয়। তার মত একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার গেজেট ও সনদ বাতিল হলে সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। 

আরো পড়ুন: আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সড়ক ঘেঁষে বহুতল ভবন নির্মাণ

এ ব্যাপারে আব্দুল বাছেত করিমের সাথে কথা বললে তিনি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, আমি একজন প্রকৃত যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাষ্ট্রীয় সম্মানিভাতা পেয়ে আসছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আমার গেজেট ও সনদ বাতিলের বিষয়টি আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করি।

এ ব্যাপারে যুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার খোরশেদ আলম তালুকতার (বীর প্রতীক) বলেন, আব্দুল বাছেত করিম আমার অধীনে সে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।  

যুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার ও সাবেক টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. ফজলুল হক (বীরপ্রতীক) জানান, আব্দুল বাছেত করিমকে যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে ছোট যোদ্ধা হিসাবে দেখেছি। তার গেজেট ও সনদ বাতিল করা মানে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করা। 

যুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার ও প্রশিক্ষক রবিউল আলম গেরিলা, ঘাটাইল উপজেলা সাবেক কমান্ডার মো. হাবিবুর রহমান খান, সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল আলম মনি, বীর মুক্তিযোদ্ধা এমদাদুল হক খান হুমায়ুন ও আব্দুস সাত্তার মিয়া জানান, আব্দুল বাছেত করিম একজন প্রকৃত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। কে বা কারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয়পতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা এ ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানাই। 

ইত্তেফাক/এএএম