বইমেলা না হওয়ার পেছনে যুক্তি কী?

বইমেলার মাধ্যমে একটা জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিকাশ হয়। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। যোগাযোগটা আরো বৃদ্ধি পায়, সমৃদ্ধ হয়।

যে মানুষটি সহজে বই পড়ে না, তারও বইমেলা প্রাঙ্গণে হেঁটে গেলে বই কেনা ও পড়ার তীব্র ইচ্ছা জন্মে। ছাত্রজীবন থেকেই বইমেলা প্রাঙ্গণে হাঁটার অভ্যাস। অনেক মানুষ দেখেছি, মেলাপ্রাঙ্গণে জীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে বই পড়েনি, তারও অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে গেছে। সাহিত্য মনন ও চিন্তার বিস্তৃতি ঘটেছে।

তাছাড়া ৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় এই বইমেলার মাধ্যমে। ৫ লাখ লোক নির্ভরশীল এই বইমেলার ওপর। যে প্রকাশকের একমাত্র আয় এই বইমেলাকে ঘিরে, তার থাকে সারা বছরের স্বপ্ন। যে লেখক দুটো পয়সা আয় করেন তার লেখালেখির মাধ্যমে, এই বইমেলা তার কাছে স্বপ্নের মতো। তিনি সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই একটি মাসের জন্য। বইমেলা উপলক্ষ্যে যে লেখক সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন তার নতুন বইটি পাওয়ার জন্য। তার কাছে এই মেলার সময়টি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

উগ্র মৌলবাদ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপশক্তি যখন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, ভয়ংকরভাবে ঠিক তখন সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের বিরুদ্ধে হঠাত্ এই ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের কী ইঙ্গিত দেয়। মানুষ সাহিত্যে মননে ও চিন্তায় আরো পিছিয়ে যাবে।

লেখক, প্রকাশক ও পাঠক চরমভাবে হতাশ হবে। অনেকে শিক্ষকতা পেশার মতো এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। অপূরণীয় ক্ষতি হবে, কর্তৃপক্ষ কী একটিবারের জন্য ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

 এই একটি মাসেই বাংলাদেশের ইতিহাসে বছরের সর্বোচ্চ বই বিক্রি হয়। যেখানে ছয় মাস যাবত্ দেশের সব পাবলিক প্রতিষ্ঠান খোলা, সেখানে বইমেলা কীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় আমি বুঝি না।

ভার্চুয়াল বইমেলা কোনো মেলা হতে পারে না। এই মেলার কোনো প্রভাব পড়বে না লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মাঝে। কোনো উচ্ছ্বাস-আগ্রহ নিয়ে এই মেলা থেকে কেউ বই কিনবে না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ প্রয়োজনীয় বইটিও হয়তো নেবে না। রকমারি ডট কম তো রয়েছে সেই জন্য।

বইমেলাও একটি জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি—অনেক কিছু ধারণ করে। সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ হয়। অনেক সৃজনশীল লেখকের পাশাপাশি অনেক সৃজনশীল পাঠকও তৈরি হয়। শিল্প-সাহিত্য একটি জাতির অন্যতম সম্পদ মেরুদণ্ডও বলা যায়। বইমেলা হচ্ছে তার অন্যতম অনুষঙ্গ।

এবার বইমেলা না হলে কত বড় ক্ষতি হবে এই জাতির, কত বড় ক্ষতি হবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির, তা আমি অতি অল্প কথায় বোঝাতে পারব না।

অনেক কিছু হারিয়ে যাবে—এবার বইমেলা না হলে। আমি জানি না এই মুহূর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন, কার কথা শুনছেন। যারা এই বিষয়ে খুব ভালো পরামর্শ দিতেন, তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই।

সবশেষে বলতে হয়, আমাদের জাতির অনেক বড় একটা গৌরবের ইতিহাস আছে। মুক্তিযুদ্ধ ও সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষা-সংগ্রামের ইতিহাস। ৩০ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ, এই জাতি কখনো অকৃতজ্ঞ হতে পারে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ অনেক এগিয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, পদ্মা সেতু নির্মাণসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ তিনি করেছেন। তিনি শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন নানাভাবে, সম্মানিত করেছেন বিভিন্নভাবে। আজ তার কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি,  দয়া করে বইমেলা বন্ধ করবেন না, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে হলেও বইমেলার অনুমতি দিন।

আবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত একটিবার ভেবে দেখুন।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শীত চলে গিয়ে বসন্ত আসে। তখন শীতের প্রকোপ চলে যায় বলতে গেলে পুরোপুরি। শীত চলে গেলে করোনার প্রকোপও কমে যাবে আশা করি। আর তাছাড়া স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বিধিব্যবস্থা নিয়ে মেলা করা যেতেই পারে, যেখানে সব মার্কেট ও পর্যটন স্পট এবং যানবাহন টার্মিনালে মানুষের ভিড় লেগেই আছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, তাহলে বইমেলার প্রতি এই আচরণ কেন হঠাত্।

n লেখক :গবেষক