প্রতিযোগিতা হোক নিজের সঙ্গে, সম্প্রীতি হোক সবার সঙ্গে

প্রতিযোগিতার এ যুগে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এ লড়াইয়ে আমরা সবাই যোদ্ধা। আমরা সবাই চাই নিজেকে বড় প্রমাণ  করতে। নিজের দক্ষতা-কাজকে সর্বোত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। আর এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে হলে নিজেকে আরো বেশি কর্মঠ, দক্ষ, পরিশ্রমী হতে হবে—যাতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি।

তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এই খেলায় মেতে উঠে আমরা অনেকেই প্রতিযোগিতাকে প্রতিহিংসায় পরিণত করছি, যা পুরোপুরি অনুচিত। এই প্রতিহিংসা ছড়িয়ে পড়েছে সব বয়সের, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে। ছাত্রজীবন থেকেই তার প্রকাশ ঘটে। বর্তমানে মা-বাবারাও সন্তান বিদ্যালয়ে কতটুকু সুশিক্ষা পাচ্ছে সে বিষয়ে সামান্য চিন্তিত না হলেও বছর শেষে সে প্রথম পজিশনে থাকতে পারছে কি না, সেইটা নিয়েই বেশি চিন্তা। কোনোভাবে সেই বাচ্চা যদি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় তাহলে অনেক পরিবারে এতটাই বকাবকির সম্মুখীন হতে হয়, যা তার প্রতিযোগিতার মনোভাবকে ধীরে ধীরে প্রতিহিংসায় রূপান্তর ঘটায়। তখন সে তার সহপাঠীকে তার শত্রু বানিয়ে ফেলে।

বাচ্চা বয়সে যে প্রতিহিংসার বীজ আমরা শিশুমনে বপন করি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার যেন শাখা-প্রশাখার জন্ম নেয়। আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কতটুকু পরিশ্রমী বা অধ্যবসায়ী ছিলাম, কেন বা সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলাম না, কোথায় আমাদের অদক্ষতা—সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে, যে বা যারা আমাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছে, তাদের যেন শত্রু বলে মনে হয়। ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মক্ষেত্রে, পরিবারেও এই প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাবের প্রকাশ অনেক সময় হয়ে থাকে।

আজ আমরা ভুলেই গেছি প্রশংসা করতে। একজন ব্যক্তি প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করলেও আমরা আজ প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করি। আমাদের উচিত তাদের উত্সাহ দেওয়া, কিন্তু আমরা করি ঠিক তার উলটো। আমরা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তার কাজের ভুল ধরতে, সুযোগ বুঝে তার দুর্বল বিষয়ে আঘাত করে কী করে তাকে দমিয়ে রাখা যায়, সেই চেষ্টা বেশি করে থাকি। এই প্রতিহিংসা প্রথমত অন্যায় হয়ে সামনে এলেও মাঝে মধ্যে তা অপরাধবৃত্তি পর্যন্ত মানুষকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি, আমাদের মনুষ্যত্ব সব বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

আসুন না আমরা নিজেদের অভ্যাস, আচরণে সামান্য পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। প্রতিযোগিতা করি, অবশ্যই করি তবে সেটা নিজের সঙ্গে। আপনি একটা লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে আপনার কী কী গুণ, দক্ষতা লাগবে, কী কী কমতি আছে—সেগুলো অর্জনের চেষ্টা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাই। কিন্তু সেই পথে পৌঁছাতে কাউকে আঘাত করে, কারো সঙ্গে অন্যায় করে, শত্রুতা করে যেন জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তা যেন অর্জনের হয়। আমরা তো চাইলেই পারি অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করতে। সেই কাজগুলো থেকে শিক্ষা নিতে। প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা যেমন থাকে, তেমনি কিছু সুন্দর অর্জনও থাকে। আমরা চাইলেই পারি সেই সুন্দরকে ধারণ করতে।

প্রতিটি মানুষের মাঝে নিজস্ব কিছু যোগ্যতা থাকে। সবাই সবকিছু পারে এমনটা যেমন হয় না, পাশাপাশি চেষ্টা করলে আয়ত্ত করা সম্ভব না তাও না। প্রতিহিংসা পরিহার করে আমরা নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব বজায় রাখি, একে অপরকে সাহায্য করি, নতুন পথের দিশা দেখায়, উত্সাহ দেই—তবেই পৃথিবীর এই অপার সৌন্দর্য আমাদের চোখে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ধরা দিতে বাধ্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়