বা ংলাদেশ নামের এ দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর থেকে। আমাদের বিজয় অর্জনের প্রায় ৫০ বছর হতে চলেছে। আগামী বছর অর্থাত্ ২০২১ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালিত হবে। দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংযজ্ঞ, ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বহু মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এ দেশটাকে পেয়েছি। ’৭১-এর ধ্বংস্তূপ থেকে দেশটি নবজন্মের প্রত্যয় নিয়ে বহু চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে একটু একটু করে মাথা উঁচু করে আজ বিশ্বদরবারে পরিচিতি লাভ করেছে। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। এ দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এ দেশের ছাত্র ও যুবসমাজ। তারাও এখন বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার গতিময় নেতৃত্বের কারণে দেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আজন্ম স্বপ্ন সোনার বাংলাকে গড়তে তিনি বিরতিহীনভাবে কাজ করে চলেছেন। স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দীতে এসে দেশ হয়তো আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ অসত্ মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসার কারণে যেখানে পৌঁছার কথা ছিল সেখানে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য বর্তমান সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলেও দুর্নীতির মহোত্সব কমছে না। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীকে সামনে রেখে সরকার দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরে দেশটাকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বিজয়ের মাসে—এটাই এ দেশের আপামর জনগণের চাওয়া।
আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে যেমন পরিচিতি লাভ করেছে তেমনি পরিচিতি লাভ করেছে জনসংখ্যাবহুল দেশ হিসেবেও। জনসংখ্যার দিক থেকে দেখা যায়, ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৪ কোটি কিন্তু আমাদের গড় আয়ু ছিল মাত্র ২৭ বছর। ১৯৭১ সালে এ সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩০ লাখে। ২০১১ সালে গড় আয়ু ছিল প্রায় ৭০ বছর। বর্তমানে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটিতে। জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য-সচেতনতা সৃষ্টির কারণে গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্রটা যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এই অর্থ ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে ২০১২-১৩ অর্থবছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট মিলে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই বাজেটের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। আমাদের অর্থনীতির বা উন্নয়নের চাকা যে দ্রুত ঘুরছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, তা এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বিগত দশকে অর্থাত্ ২০০২ থেকে ২০১১ সময়ে জিডিপি গড়ে ২৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ওপরে ছিল। বিগত দুই দশক থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এ ধারা আরো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশের ওপরে যা আমাদের আশান্বিত করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৫ শতাংশ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অর্থাত্ ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। সময়ের পরিক্রমায় দেশের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে এ আয় ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ২০৭৯ ডলারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত খাতে বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষিক্ষেত্রে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ হলেও আমরা কৃষিতে স্বয়ংসম্পর্ণূ হতে পেরেছি। খাদ্যের অভাবে মারা যাওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে এখন আর ঘটছে না। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধির হার ৮.২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, এ বছরে অর্থাত্ ২০২০ সালের প্রথম দিক থেকেই কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে দেখা দেওয়ায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জন আর কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের মতে, করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে যেতে পারে। শুধু আমরা না, পৃথিবীব্যাপী এ মহামারি সামাজিক ও অর্থনেতিক দিক থেকে ধস নামিয়েছে। কেড়ে নিচ্ছে লাখো মানুষের প্রাণ। করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দাকেও তা ছাড়িয়ে যাবে। করোনার কারণে ৫০ কোটি লোক নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাপী ৩৩০ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়তে পারে। ফলে শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির হারও কমে যেতে পারে। এতে করে আমাদের মাথাপিছু আয়ও কমে যাবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবদান ১৯ শতাংশ। করোনার প্রভাব পড়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে। ফলে চলতি বছরে চীনের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। বাংলাদেশের পোশাক খাতসহ অন্যান্য রপ্তানিজাত পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। চীন হচ্ছে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার। করোনার কারণে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। বিশ্ব জুড়ে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর জন্য সরকারের আগাম প্রস্তুতি রাখতে হবে। তার পরও আশা করব, যেটুকু প্রবৃদ্ধি হবে সেটার সুফল যেন এদেশের সব জনগোষ্ঠী পায়। ২০২১ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী। সরকার টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রূপকল্প ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। কিন্তু মহামারি করোনা আমাদেরকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। করোনার প্রভাবে বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১০.০৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে, করোনার কারণে এ হার ২৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। এজন্য করোনা-পরবর্তী সংকট মোকাবিলার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতসহ এসএমই খাতের বিকাশ ঘটাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। কারণ, স্বল্প পুঁজিতে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ এ খাতেই সম্ভব। বিজয়ের মাসে এবং স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এ দেশকে আরো এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার বা শপথ নিয়ে সরকারসহ দেশের আপামর জনগণ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসবে—এটাই আমাদের আগামী দিনের প্রত্যাশা।
লেখক: অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক