একটি দুঃসহ কথোপকথন

বরেন চক্রবর্তী

 

পাকিস্তানি এক সেনাকর্তার সামনে তিনি তখন দাঁড়িয়ে।

হাত দুটো বাঁধা পেছন দিকে, চোখজোড়া তখনো ঢেকে দেওয়া হয়নি কালো কাপড়ে। 

যেসব আলবদর তাঁকে ধরে এনেছিল বাড়ি থেকে, সেনাকর্তার সামনে তারা

বিগলিত ছিল শিকার ধরার আনন্দে।

এরপর টিকটিকির মতো স্থির দৃষ্টি নিয়ে জেরা শুরু করেন সেনাকর্তা।

— কী নাম?

— ডাক্তার ফজলে রাব্বী।

— কী করেন?

— ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিনের অধ্যাপক।

— আচ্ছা! আপনি তাহলে একজন গ্রেট প্রফেসর, প্রস্টিটিউট নন।

— দয়া করে মুখ সামলে কথা বলুন জনাব।

— সরি প্রফেসর, তবে যে কি না স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে

সে কি গণিকার চেয়েও খারাপ নয়?

— হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

— কিন্তু প্রফেসর, আপনি কেবল সেসব বিশ্বাসঘাতকদের চিকিত্সাই করেননি

তাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন।

— কিন্তু আমি তো কোনো বিশ্বাসঘাতককে আশ্রয় বা আহার দেইনি!

— আপনি মিথ্যা বলছেন প্রফেসর, আপনি মিথ্যুক। মুক্তিবাহিনীকে আপনি আশ্রয় দিয়েছেন।

ওরা বেইমান, ওরা পবিত্র পাকিস্তানের শত্রু।

— ডাঁহা মিথ্যা বললেন জনাব। মুক্তিবাহিনী এ জাতির সঙ্গে বেইমানি করেনি,

বরং তারা সংশপ্তকের মতো লড়ে যাচ্ছে এ জাতিকে বাঁচাতে। ...

ডাক্তার রাব্বীর তেজস্বী বচনে চমকে ওঠে এক আলবদর। গর্জে ওঠে—

‘দেখলেন স্যার, কত বড় সাহস! ...বাচ্চা গলা চড়িয়ে কথা বলে আপনার সামনে?

শুট হিম স্যার। শুট হিম।’

পাকিস্তানি সেনাকর্তা সাপের মতো ঠান্ডা থাকেন। এগিয়ে আসেন আরো।

বরফস্থির চাউনিতে প্রশ্ন করেন,

— আপনি কি স্পেশালিস্ট ডাক্তার?

— হ্যাঁ, আমি একজন হূদরোগ বিশেষজ্ঞ, কার্ডিওলোজিস্ট।

— বাহ! বেশ বেশ! আপনি একজন হার্ট স্পেশালিস্ট।

হিসহিস করে ওঠেন সেনাকর্তা, আমার খুব ইচ্ছে একজন হার্ট স্পেশালিস্টের হার্ট দেখার।

এ আমার গোপন-গহিন কৌতূহল। আহ! কৌতূহল পূরণের কী চমত্কার একটি দিন আজ।

শোনো প্রফেসর, পাকিস্তানি জাতির সঙ্গে তুমি বেইমানি করেছ। আইন ভঙ্গ করেছ।

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সেনাকর্তা, ভয় কী? আমি খুব বেশি হিংস্র বা নৃশংস নই।

তোমার জঘন্য অপরাধের তুলনায় শাস্তি খুব সামান্য—

আমরা কেবল তোমার বুকের ভেতর থেকে বের করে আনব জ্যান্ত হূদপিণ্ডটা।...

ইলেক্ট্রোকার্ডিয়োগ্রামের মতোই খুব সাধারণভাবে বের করা হবে।

আমি ধারণা করি, কার্ডিওলোজিস্ট হিসেবে তুমি খুব উপভোগ করবে এ ঘটনা।

ষোলই ডিসেম্বর সকালে প্রফেসরের মৃতদেহ পাওয়া গেল রায়েরবাজারের মাঠে।

ডাক্তার রাব্বীর অক্ষত সারা শরীর, কেবল হূদপিণ্ডখানি খুঁজে পাওয়া যায়নি বুকের পিঞ্জরে।

(অংশবিশেষ), ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার দত্ত

কবির A Nation Confesses কাব্য (অবসর, ২০১৪) থেকে অনূদিত