একাত্তরের শরণার্থী ও ইন্দিরা গান্ধী

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে চলে ১৬ই ডিসেম্ব্বর পর্যন্ত। দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহর-বন্দর-গ্রাম-পাড়া-মহল্লা সর্বত্র চালিয়ে যায় অবাধ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও নির্বিচার গণহত্যা। আনুমানিক ১ কোটি নিরপরাধ মানুষ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বলতে গেলে প্রতিনিয়ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের মুখে অনন্যোপায় হয়ে প্রাণে বেঁচে থাকার আর্তি নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন প্রদেশে গিয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। বাঙালি উদ্বাস্তুদের সবচেয়ে বেশিসংখ্যকের ঠাঁই হয় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসাম প্রদেশে। যুদ্ধকালীন চরম অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে ভারত সরকার জায়গায় জায়গায় অসংখ্য আশ্রয়শিবির তৈরি করে উদ্বাস্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাবার, কাপড় ও ওষুধ-পথ্যসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে। মানবিকতার এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

১৬ই ডিসেম্ব্বর ঢাকায় মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকাসহ আমাদের দেশের গ্রাম-গঞ্জ-বন্দরের মতো ভারতের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতেও প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ক্ষুধাক্লিষ্ট ও নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত ভাগ্যবিড়ম্ব্বিত মানুষগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। সবার মধ্যেই আশার পুনরুজ্জীবন ঘটে। দীর্ঘ আত্মাহুতি ও অপরিমেয় ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং পথপরিক্রমায় অবশেষে স্বাধীন হয়েছে দেশ। এবার তাদের যাবতীয় দুর্গতি ও দুঃসহ দুঃখ-বিড়ম্বনার অবসান ঘটবে, নিজ দেশে; নিজেদের স্বাধীন দেশে যার যার বাড়িঘর-ঠিকানায় শিগিগই ফিরতে পারবে তারা। এভাবেই শুরু হয় দেশে ফিরে আসার ‘অভিযান’। সে আরেক অভিজ্ঞতা, সে আরেক কাহিনি। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশা, ধর্ম ও বর্ণের শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ। একই সঙ্গে সবাই ব্যাকুল হয়ে ওঠে—স্বাধীন দেশে যার যার বাড়িঘরে ফিরে আসা চাই। সর্বত্র রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত, যানবাহনও খুবই সীমিত-অপ্রতুল। অনেকটা যাওয়ার সময়কারই অবস্থা। কোথাও কোথাও আরো দুরবস্থা। কিন্তু না। এবার ভিন্ন পরিস্থিতি-পরিবেশ। পরিবার-পরিজনসহ ট্রেন, বাস, নৌকা বা পায়ে হেঁটে যেভাবেই যাত্রা শুরু করুক, যাওয়ার সময়ের মতো আসার রাস্তায় অন্তত মানুষরূপী দানবের দ্বারা অতর্কিত আক্রান্ত হয়ে তাদের প্রাণনাশের কোনো আশঙ্কা নেই। ছুটছে তারা দলে দলে, এবারও যেন জনস্রোত। একেক জনের মন হাসি-আনন্দ-দুঃখ-বেদনার মিশ্রণে আচ্ছন্ন। তবুও স্বভূমিতে ফেরা বলে কথা—‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’ নিজেদের ভিটেমাটি, বাপদাদার ঠিকানায় ফিরে আসা, আহা!

কলকাতা থেকে বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) ও পিটিআই (প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া) পরিবেশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, আমাদের দেশ হানাদারমুক্ত হবার প্রথম ২৩ দিনে (১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত) ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের আশ্রয়শিবিরগুলো থেকে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ দেশে ফিরে আসে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্যে। উল্লিখিত ১৫ লাখের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ফেরেন ৭ লাখ ১৩ হাজার, ত্রিপুরা থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার, মেঘালয় থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার জন। এছাড়া এই ২৩ দিনে আসাম থেকে ফিরে আসেন ১০ হাজার ১৮০ জন, বিহার থেকে ৬৫১ জন এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে ৩২৪ জন শরণার্থী নিজেদের দেশে ফিরে আসেন (তথ্যসূত্র : দৈনিক বাংলা ১২ জানুয়ারি ১৯৭২)।

পর্যায়ক্রমে এভাবেই দলে দলে স্বভূমিতে ফিরে আসে একদা ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া শরণার্থীরা। কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাবার ও ওষুধ-পথ্য দান এবং ফিরে আসতে সর্বত সহযোগিতাসহ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবদান গোটা জাতির  কাছে প্রাতঃস্মরণীয়।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক