এই জগতের প্রতিটি মানুষ কমবেশি রাগান্বিত হয়। কেহ তাহা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারে, কেহ পারে না। কিন্তু যাহারা দায়িত্বশীল পজিশনে থাকেন তাহাদের মেজাজ হারাইবার কোনো সুযোগ নাই। কারণ দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকিতে হয়। তথাপি কেহ কেহ মেজাজ হারান। ইহার কারণ মূলত প্রতিটি মানুষের ভিতরে জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতে কিংবা অবচেতনে হতাশা কাজ করিয়া থাকে। আমরা জানিতে পারি না যে আমাদের মধ্যে, আমাদেরই অজান্তে ক্রোধ অথবা হতাশা জমাট বাঁধিতেছে। তাহাই একসময় বিস্ফোরিত হইতে চাহে অথবা হইয়া থাকে। তবে সুযোগ্য তাহারাই, যাহারা এই ভেতরের বিস্ফোরণকে নিজের স্থিরতা দিয়া নিয়ন্ত্রণ করিতে পারেন। ইহা একটি পেশাগত দক্ষতা বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। আর যাহারা পারেন না তাহারা ধ্বংসের কারণ হইতে পারেন, পতনের কারণ হইতে পারেন কিংবা ব্যবস্থাপনায় গোলমাল বাধাইয়া ফেলিতে পারেন। সেই সঙ্গে ইহা ব্যক্তিমানুষের ভাবমূর্তিকেও খাটো করিয়া থাকে। এই যে দেশের অন্যতম সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম ঢাকা-বরিশাল খেলা চলিবার সময় সতীর্থের সঙ্গে মেজাজ হারাইলেন এবং তাহা লইয়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সমালোচনার সম্মুখীন হইলেন, তাহা কি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারিবার ফল নহে? এই মেজাজ ধরিয়া রাখিবার দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কিন্তু বড় বড় প্রতিষ্ঠান যাহারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহাদের অনেক বেশি। হউক ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন, করপোরেট হাউজ অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন। সেই কারণেই আমেরিকার বেসবল ন্যাশনাল লিগের সাবেক পরিচালক ও সাংবাদিক প্রয়াত ফোর্ড ক্রিস্টফার ফ্রিক বলিয়াছিলেন, ‘মাথা স্থির রাখুন। যে কোনো সিদ্ধান্ত আপনি যদি গরম মাথায় গ্রহণ করেন তাহা সুফল বহিয়া আনিবে না।’ ইহা খুব অজানা বাক্য নহে। আমাদের দেশে বহুকাল ধরিয়া প্রবাদ চালু রহিয়াছে, রাগে শস্য হয় না। শস্য ফলাইতে ধর্যের প্রয়োজন। সেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়া থাকে মানুষ রাগান্বিত হইলেই। সেই কারণেই এই উপযুক্ত প্রবাদ। এমনকি ধর্মপুস্তকেও এই সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন শরিফে সুরা ইমরান-এ পরিষ্কার বলা হইয়াছে, ‘রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের ত্রুটি মার্জনাকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও জান্নাত নির্ধারিত। আল্লাহ সত্ ও কর্মশীলদের ভালোবাসেন (সুরা ইমরান :আয়াত ১৩৪)। মেশকাত শরিফে আছে, রসুলে আকরাম বলিয়াছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেহ যখন রাগান্বিত হইল সে যেন অজু করে, কেননা রাগ শয়তানের প্ররোচনা।’
আমরা এই সকল বিষয়ে অসচেতন হইলেও পশ্চিমা উন্নত দেশসমূহ কিন্তু অসচেতন নহে। তাহারা নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মানসিক পরীক্ষা করাইয়া থাকে। কারণ একজন মানুষের মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হইলে শুধু তাহাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, গোটা প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করিয়া থাকে যাহা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপজ্জনক। কেবল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলই নহেন, সাধারণ কর্মচারী-শ্রমিকদের মানসিক সুস্থতা ক্ষোভ, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের রাখা জরুরি। কারণ প্রতিটি মানুষের ওপর যেই দায়িত্ব থাকে তাহা বিভিন্ন পরিসরে গুরুত্ব বহন করিয়া থাকে। সেই কারণে রাগ সংবরণ করিবার জন্য দেশে দেশে ধ্যানসহ ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা রহিয়াছে। প্রতিটি মানুষেরই প্রয়োজন নিজেকেও খানিকটা যাচাই করিয়া লওয়া। মহামতি সক্রেটিস বলিয়াছিলেন know thyself, বাংলায় যাহার অর্থ নিজেকে জানো। নিজেকে জানিলে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করা গেলে মানুষ নিজেকে সংবরণ করিতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, রাগ বা মেজাজ হারানো মানুষের একটি জটিল বিষয়। তাহারা ইহাকে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রণহীনতার একটি জটিল যন্ত্রও বলিয়া থাকেন। সুতরাং আমাদের অবশ্যই মনে রাখিতে হইবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রেও মেজাজ স্থিতিশীল রাখা একটি পেশাগত দক্ষতার শর্ত।