প্রবাস মানে বিদেশ বা দূরদেশ, প্রবাস মানে আত্মীয়স্বজন বিহীন বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে দেওয়া, প্রবাস মানে শত দুঃখকষ্টের সঙ্গে বিরামহীন জীবনযুদ্ধ করা, প্রবাস মানে দেওয়াল বিহীন কারাগার। পরিবারের সচ্ছলতাসহ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে নিজ মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটাতে হয় প্রবাসজীবন। হয়তো একেই বলে একধরনের দেওয়ালবিহীন কারাগার। নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবিকার তাগিদে কারো ছেলে, কারো ভাই, কারো বাবা, কারো স্বামী, একটুখানি সুখের আশায় দেশান্তরী হয়। এই দেশান্তরী হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটা নাম প্রবাসী।
প্রবাসীদের সব থেকে বড় সমস্যা হলো একাকিত্ব। আর এ কারণেই অনেক সময় অনেক ছোট সমস্যাগুলোও অনেক বেশি অস্থির ও যন্ত্রণা দেয়। আর প্রবাসীদের আপনজন বা প্রিয়জন কষ্ট দিলে সেটা সহ্য করার মতো ধৈর্যও সে হারিয়ে ফেলে। অনেকে একাকিত্বের কারণে আত্মহত্যাও করেন। প্রবাসীরা তাদের আপনজনকে কতটা ভালোবাসে, সেটা শুধু সে নিজেই জানে।
প্রবাসীদের সুখ হচ্ছে, মাস শেষে যখন হাতে বেতন আসে এবং তা পরিবারের কাছে পাঠায়। তখনই তাদের আনন্দ তখনই সুখ। যখন তারা শুনতে পায় মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই ভালো আছে, তখনই তাদের সুখ। আর দুঃখ হচ্ছে, মাস শেষে টাকা না পাওয়া এবং বাড়িতে কারো অসুস্থতা এবং সবচেয়ে কষ্টের হচ্ছে যখন বিদেশে থাকা অবস্থায় আপনজনের মৃত্যুর সংবাদ পান। প্রবাস মানে নিঃসঙ্গতা, প্রবাস মানে দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী, প্রবাস মানে নিজে রান্না করে খাওয়া, প্রবাস মানে জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে ৪০-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করে যাওয়া। প্রবাস মানে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও চোখ বুঝে সহ্য করা। প্রবাস মানে দীর্ঘ নিঃশ্বাস। সবকিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় পরিবার, সমাজ এবং দেশ থেকে প্রবাসীরা অবহেলাও পান।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর চাবিকাঠি তো দীর্ঘকাল ধরেই প্রবাসীদের নিয়ন্ত্রণে। প্রবাসীরা কষ্টার্জিত যে অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন তাকে রেমিট্যান্স বলা হয়। সেই রেমিট্যান্স সমাজ ও দেশের জন্য ব্যয় করা হয়। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে দেশের উন্নতি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর হাজার কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা গুণছে প্রবাসীদের কল্যাণে। প্রবাস মানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা একদল খেটে খাওয়া মানুষ।
বিশ্বব্যাপী করোনার প্রকোপে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক প্রবাসী কাজ হারিয়েছেন। আবার যারা ছুটিতে দেশে এসেছিলেন, তারাও অনেকেই প্রবাসে ফিরে যেতে পারেননি। যার কারণে দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। তবে এ অবস্থা থেকে কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে থাকবে বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই আমাদের অর্থনীতির চাকা বেগবান হয়। আমরা সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছি। সম্মান করা উচিত সব প্রবাসীকে। কিন্তু তাদের প্রতি সুন্দর ব্যবহার উপেক্ষিত। সম্প্রতি মহামারি করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে দেশে আসা সব প্রবাসীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই হেয় করে কটূক্তি করেছেন, যা খুবই নিন্দনীয়। এমন আচরণে প্রবাসীদের হূদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যেসব প্রবাসী ভাই দেশে এসেছেন সুরক্ষার জন্য। তাদের সরকারি নির্দেশনা মেনে ১৪ দিন নিজ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ না দিয়ে অনেকেই অতি উত্সাহী হয়ে সেসব রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তি করেছেন। এতে তাদের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে। তাই প্রবাসীদের প্রতি সুন্দর ব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা, প্রবাসী পরিবারকে আইনি-সহায়তা, চিকিত্সা, শিক্ষা ও সামাজিকতায় অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি প্রবাসী একেকটি জীবনযুদ্ধের সৈনিক। করোনা নামক ভাইরাসের কারণে আজ সমগ্র পৃথিবী নীরব ও নিস্তব্ধ। দিন দিন মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। জীবন-সংগ্রামের এই সময়ে প্রতিটা মুহূর্তে কতই না উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও উচ্চস্বপ্ন নিয়ে পথ চলে একেক জন প্রবাসী। সবকিছুর পরেও ঐ প্রবাসীরাই আমাদের দেশের সম্পদ, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, আমাদের অহংকার ও গৌরবের প্রতীক। ভালো থাকুক প্রবাসীরা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ