নুরু নাপিত

অগ্রহায়ণ মাস। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। অতিরিক্ত শীত পড়ার কারণ আচমকা বৃষ্টি। এখন বৃষ্টি হওয়ার কথা না। এ বছর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। চৈত্র মাসে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘুমন্ত মানুষের ওপর কাপুরুষের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নৃশংসভাবে হত্যা করেছে এদেশের মানুষদের। বাংলাদেশের মানুষ সেই নৃশংসতা মুখ বুজে সহ্য করেনি। তারা পালটা আক্রমণ করেছে। শুরু হয়েছে লড়াই। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযোদ্ধা দল এগিয়ে আসছে। কমান্ডার হান্নানের সাথে এসেছে নুরু। তার বয়স ১২ বছর। সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। নুরু বাবার সঙ্গে সেলুনে কাজ করে। তাই সবাই তাকে নুরু নাপিত বলে ডাকে।

নুরু গিয়েছিল কমান্ডার হান্নানের সাথে দেখা করতে। সে গিয়ে হান্নানকে বলল, আমাকে যুদ্ধে নিয়ে চলেন।

হান্নান বলল, তোমার বয়স অল্প। ছোটো ছেলেমেয়েদের যুদ্ধে যেতে নেই।

নুরু বলল, আপনি আমাকে না নিয়ে গেলে আজ রাতে আমি বাড়ি ছাড়ব। যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাব সেখানে চলে যাব।

হান্নান অসহায় বোধ করল। সে নুরুর বাবার সাথে কথা বলল। নুরুর বাবা নুরুকে যুদ্ধে যেতে দিতে রাজি হলেন। নুরু লাফাতে লাফাতে হান্নানের সঙ্গে যুদ্ধে চলে এল।

কুয়াশাঢাকা কনকনে শীতের রাত। নুরু ঢুকেছে গ্রামে। সে গেছে অবস্থা দেখতে। খবর পাওয়া গেছে আজ রাতে পাকিস্তানি আর্মিরা জলডুবি গ্রামে ঢুকবে। পাকিস্তানি মিলিটারি গ্রামে এলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আক্রমণ করবে।

আশপাশ ভালো করে দেখে নুরু ফিরে এল।

হান্নান বলল, কী খবর গ্রামের?

নুরু বলল, সব ঠিক আছে। এখন গ্রামে ঢোকা যায়।

মুক্তিযোদ্ধা দল জলডুবি গ্রামে ঢুকে পড়ল।

তারা বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেল গ্রামের ভেতর। যেতে যেতে আচমকা নুরু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

হান্নান বলল, কী হলো, থামলে কেন?

নুরু বলল, একটু দাঁড়ান। ঘটনা বুঝে নিই।

রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। নুরুর ওপর তাদের আস্থা আছে।

গ্রামের কুকুরগুলো ভীষণ জোরে চিত্কার করছে। কুকুরের ডাক নুরু বুঝতে পারে। সে গ্রামের ছেলে। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে কুকুর ভিন্নভাবে ডাকে। নুরু দ্বিধায় পড়ে গেল। কুকুরগুলো একসঙ্গে চিত্কার করছে। জলডুবি গ্রামের কুকুরের ডাক শুনে পাশের গ্রামের কুকুর ডাকতে শুরু করেছে। কুকুরগুলো গ্রামের মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার মতো করে ডাকছে। গ্রামে ডাকাত পড়লে কুকুর এরকম করে ডাকে।

নুরু নিশ্চিত হয়ে গেল গ্রামে একদল অপরিচিত মানুষ এসেছে। সে অনুমান করল তারা পাকিস্তানি সেনা।

নুরু বলল, আপনারা এখানে থাকেন। আমি সামনে থেকে ঘুরে আসছি।

হান্নান বলল, সাবধানে যাবে। কুকুরগুলো এমন ভয়ংকরভাবে ডাকছে কেন?

নুরু বলল, সেটাই দেখতে যাচ্ছি।

নুরু এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে দেখে তার অনুমান সত্য। পাকিস্তানি সৈন্য এসে গ্রাম ভরে গেছে।

শব্দ না করে দৌড়ে ফিরে এল নুরু। মুক্তিযোদ্ধা দলকে ঘটনা জানাল।

পাকিস্তানি সেনাদের দেখা গেল রাস্তায়। তারা জলডুবি গ্রাম দখল করতে আসছে।

হান্নান বলল, ফায়ার।

অমনি পাকিস্তানি সৈন্যদের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি করল মুক্তিযোদ্ধারা। দুজন গ্রেনেড ছুড়ে দিল।

পাকিস্তানি সৈন্যরা নিজেদের প্রস্তুত করার সময় পেল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন গুলি খেয়ে পড়ে গেল। আচমকা আক্রমণের মুখে পড়ে তারা হতভম্ব হয়ে গেছে। ভয় পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পেছন ফিরে দৌড়ানো শুরু করল। সেদিকেও ছিল মুক্তিযোদ্ধা দল। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘেরাওয়ের ভেতর পড়ে গেল। পালানোর পথ না পেয়ে তারা পালটা গুলি ছুড়তে লাগল। শুরু হলো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধ।

দু’পক্ষই গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টাদুয়েক চলল প্রচণ্ড গোলাগুলি। তারপর একসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দিক থেকে গুলি করা কমে এল। তাদের গুলি ফুরিয়ে আসছে। বেশ কয়েকজন সৈন্য মারা পড়েছে।

যুদ্ধে টিকে থাকতে পারল না পাকিস্তানি সেনারা। যে কয়েকজন বেঁচে আছে তারা পেছাতে থাকল। পেছাতে পেছাতে পেছন ফিরে জলডুবি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল।

কনকনে শীতের রাতের অন্ধকারে একদল বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে শোনা গেল সাহসী স্লোগান, জয় বাংলা।

মুক্তিযোদ্ধা দল যুদ্ধ জয় করে সামনে এগিয়ে চলল। তাদের সঙ্গে চলল কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নুরু নাপিত।*

 

*সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি লেখা হয়েছে— লেখক