আধুনিক সভ্যতায় পুলিশিং একটি রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ইহা লইয়া কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিক রাষ্ট্রের নিকট প্রথম যেই জিনিসটি চায় তাহা হইল নিরাপত্তা। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পুলিশ বাহিনী। এই ধারণাকে কেন্দ্র করিয়াই গত প্রায় এক-দেড় শতকে উন্নত বিশ্বের দেশসমূহ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানকে প্রাধান্য দিয়া পুলিশ বাহিনীর সার্বিক কাঠামো তৈরি করিয়াছে। বাংলাদেশে বর্তমানে পুলিশের যে কাঠামো রহিয়াছে তাহার ইতিহাসও খুব অধিক প্রাচীন নহে। ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলে পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল প্রণয়ন করিয়া সূচনা ঘটায় পুলিশ কার্যক্রমের। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ কাঠামোতে পরিবর্তন আসিয়াছে, যুগের সহিত তাল মিলাইয়া আধুনিক হইয়াছে নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের সৈনিকেরা। তবে প্রশ্ন হইল, পুলিশ কি নাগরিকের নিরাপত্তা আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতেছে?
সামাজিক শৃঙ্খলা ও মানবতার ধারকের ব্রত লইয়া আজ হইতে ৩-৪ হাজার বত্সর পূর্বে আদিম একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে মানবসভ্যতায় পুলিশের আগমন। মহান এই ব্রতের ধারণা হইতে পুলিশের উদ্ভব হইলেও যুগে যুগে দুষ্ট শাসক, ক্ষমতাবানরা পুলিশকে অত্যাচার করিবার সবচাইতে ধারালো ও কার্যকর অস্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করিয়া আসিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণ পুলিশের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ জানাইয়া থাকেন। পুলিশকে যেইখানে বলা হইয়া থাকে জনগণের বন্ধু, সেইখানে জনগণই যখন পুলিশের বিরুদ্ধে অন্যায়-অত্যাচারের অভিযোগ উত্থাপন করে তখন তাহা হতাশার কারণ হইয়া পড়ে। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বত্সরে দেশের পুলিশ বাহিনীর সময়ের সহিত তাল মিলাইয়া উন্নয়ন সাধিত হইয়াছে; আধুনিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়াছে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা; কিন্তু কাঠামোগত উন্নতি হইলেও পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকের নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তন হইতেছে না। প্রায়শই আমরা পুলিশের বিরুদ্ধে বন্ধুসুলভ আচরণের পরিবর্তে শাসক মনোবৃত্তির অভিযোগ শুনিয়া থাকি। ইহার কারণ পর্যালোচনা করিতে গেলে আমাদের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। প্রাচীনকালে এই বাংলায় তালুকদার, জমিদার, সামন্ত, রাজা, বাদশার অধীন লাঠিয়াল ও সশস্ত্র বাহিনী পুলিশের ভূমিকা পালন করিত। তাহারা যতটা না জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত থাকিত তাহার চাইতে অত্যাচার-নিপীড়নের দ্বারা মালিকদের হুকুম তামিলেই ব্যস্ত থাকিত। যুগে যুগে পুলিশের কাঠামোতে পরিবর্তন আসিলেও প্রাচীন এই মনোবৃত্তির পরিবর্তন হয় নাই অনেক ক্ষেত্রেই। আজকের দিনেও আমরা দেখিতে পাই ক্ষমতাবান কিংবা শাসকেরা তাহাদের নিজেদের স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করিয়া থাকে। আর পুলিশের মনোভাবও বন্ধুসুলভ হইবার পরিবর্তে শাসকের রূপ ধারণ করিয়া থাকে অনেকাংশে। ইহার ফলে পুলিশ আর জনগণের মধ্যে তৈরি হইয়াছে এক অজানা দূরত্ব। সাধারণ মানুষ বিচার কিংবা নিরাপত্তা বিধানের প্রশ্নে পুলিশের ভূমিকাকে প্রাধান্য দিতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তাহারা পুলিশ বলিতে ভয় পাইয়া থাকে। তবে এই কথাও সত্য, পুলিশ-জনগণের এই দূরত্বের পিছনে জনগণের অসচেতনতা, অসহযোগিতাও দায়ী। তবে পুলিশ বাহিনী যেহেতু জনগণের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত তাই যে কোনো অবহেলা কিংবা অভিযোগের পাল্লাটা তাহাদের দিকেও অধিক বর্তায়।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলিয়া আসিয়াছে। দেশের আর্থসামাজিক, অবকাঠামোগত সকল ক্ষেত্রেই অভাবিত উন্নতি সাধিত হইয়াছে। আধুনিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে গেলে জনগণের নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হইবে। পুলিশ বাহিনীতে কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনই নহে, মানসিকতার দিক হইতেও আধুনিক এবং যুগোপযোগী পরিবর্তন আনিতে হইবে। সহযোগিতা আর প্রকৃত বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমেই জনগণের পাশে দাঁড়াইয়া পুলিশ বাহিনী নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদান করিবে—ইহাই সকলের প্রত্যাশা।