করোনার মহামারি শুরু হওয়ার পর সরকার দেশের তৈরি পোশাকসহ শিল্প উত্পাদন অব্যাহত রাখার স্বার্থে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিপুল অঙ্কের ঋণের ঘোষণা দেয়। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাবে, ৪২ দশমিক ২ শতাংশ পোশাকশ্রমিক বেতনভাতা বাবদ প্রণোদনার এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রায় ৫৮ শতাংশ শ্রমিক এই সুবিধার আওতায় ছিলেন। অন্যদিকে প্রণোদনার ঋণ বিতরণে বৈষম্যও ছিল। অপেক্ষাকৃত ছোট কারখানা উদ্যোক্তাদের এই ঋণের অর্থ প্রদানে ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ ছিল। অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা এই সময়ে তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন। আবার আলোচ্য সময়ে এই খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও ছিল।
করোনার সময় তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘তৈরি পোশাক খাতে করোনা ভাইরাসের উদ্ভূত সংকট :সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক ঐ প্রতিবেদন ভার্চুয়ালি প্রকাশকালে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নুরে আলম মিল্টন ও সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা।
এ সময় ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের জিডিপিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ১০ শতাংশ। অথচ প্রণোদনার সিংহভাগই (প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা) তাদের কাছে গেছে। এটিকে বৈষম্যমূলক প্রণোদনা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সংকটকালে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে মালিকপক্ষ তত্পর ও সফল হয়েছে। এছাড়া এ ধরনের সংকট নিরসনে এতদিনেও যে তারা (মালিকপক্ষ) আত্ননির্ভরশীল হতে পারেনি, তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বিপুল প্রণোদনা পেলেও এর মধ্যে শ্রমিকের কাছে গেছে মাত্র ১৬ শতাংশ।
তিনি বলেন, চার দশক ধরে এ খাতের নেতৃবৃন্দের যে পুঞ্জিভূত মানসিকতা, অর্থাত্ সরকারি প্রণোদনার ওপর নির্ভরশীলতা, সেটি এই সময়ে আরো প্রকটরূপে দেখা গেছে।
করোনা পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতারাও তাদের নৈতিক ব্যবসার চর্চা করেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষায় গুরুত্ব দেননি। দায় এড়িয়ে গেছেন। এর বোঝা বইতে হয়েছে সরকারকে।
প্রতিবেদনে এই সংকটকালে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা এবং এর বাইরেও দেওয়া বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরা হয়।
এ খাতের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে টিআইবির পক্ষ থেকে ৯টি সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এতে শ্রমিকের স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, বিজিএমইএ কর্তৃক গাইডলাইনের ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট কারখানার ইউডি সুবিধা (রপ্তানির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির প্রাপ্যতা অনুমোদ) বাতিল করা ও জরিমানার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে সব শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা সংযুক্ত করে শ্রম আইনের সংশোধন করা, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নৈতিক ব্যবসা পরিচালনায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া, পোশাকের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ এবং কার্যাদেশের শর্তে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি যুক্ত করা, লে-অফ হওয়া কারখানার এক বছরের কম কর্মরত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, শ্রম অধিকার সুরক্ষায় ত্রিপক্ষীয় কমিটির কার্যকর তদারকির পাশাপাশি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত শ্রমিক, ছাঁটাই, রপ্তানি আদেশ বাতিল ও পুনর্বহাল, প্রণোদনার অর্থ ব্যবহার ও বণ্টনের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিয়মিত হালনাগাদ করার সুপারিশও করা হয়।