খবরটি প্রথম দেখে বিশ্বাসই হয়নি। মনে হয়েছে, যাহ্্, এটা কখনো হতে পারে? আমরা জ্ঞানে পিছিয়ে? আমাদের দেশে টেলিভিশন, ফেসবুক, সংবাদপত্র খুললে দেখা যায়, সবাই জ্ঞানীর মতো কথা বলছে। যে কোনো সমস্যার তাত্ক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বাতলে দিচ্ছে, সেই দেশ নাকি জ্ঞানের দিকে থেকে পিছিয়ে!
হ্যাঁ, সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক জ্ঞানসূচকের (গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সের) তালিকায় এমন কথাই বলা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্ঞানসূচকে বিশ্বের ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাংলাদেশ।
২০১২ সালেও গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১২তম। সূচক অনুযায়ী, মধ্যম মানের ২৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৯ নম্বর স্থানে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে আছে ভারত। আর সবার নিচের অবস্থানে বাংলাদেশ।
এই খবরটি শোনার পর কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে। যে দেশের মানুষ কোনো বিনিয়োগ ছাড়া ছলে-বলে-কৌশলে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে রাতারাতি মিলিওনিয়ার বনে যায়, এক শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে বিচিত্র সব যান তৈরি করে ফেলে, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই জিঞ্জিরা ও ধোলাইখালে যে কোনো ধরনের ‘অরিজিনাল ডুপ্লিকেট’ জিনিস বানায়, সে দেশ জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে—এই তথ্য মেনে নেওয়া আসলেই কঠিন!
আমাদের দেশের মানুষ সবজান্তা সমশের, কেউ কারো থেকে কম জানে না, বরং বেশিই জানে। সবাই সব ব্যাপারে শেষ কথা বলে দিচ্ছেন, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করছেন। নানা ধরনের দর্শন ঝেড়ে দিচ্ছেন। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচারকে একমাত্র ধ্রুবজ্ঞান করে অন্য সবার সব মতকে বাতিল করে দিচ্ছেন। অন্যকে তুলাধুনা করছেন। সেই দেশকে যদি বলা হয় যে জ্ঞানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে, তাহলে সেই তালিকা প্রণয়নকারীদের ঝাঁটাপেটা করার ইচ্ছে ছাড়া আর কোনো কিছু মাথায় আসে কি?
আরে বাবা, জ্ঞান আমাদের কারো চেয়ে কম নেই। বরং অন্য যে কোনো জাতির তুলনায় অনেক বেশি আছে। আমাদের আর যা কিছুরই অভাব থাকুক না কেন, জ্ঞান ও জ্ঞানী লোকের কোনো অভাব নেই। ফেসবুক, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা, অফিস-আদালত, ট্রেন বাস, গলির মোড়, ফাস্টফুডের দোকান, খেলার মাঠ, হাটবাজার, চায়ের দোকান, ইউটিউব, জলসা, ওয়াজ মাহফিল—সবখানে জ্ঞানীদের সমারোহ। কান পাতলেই কান ঝালাপালা শুরু হয়ে যায়। সমাজ-সংসার-দেশ-জাতি-বিশ্ব নিয়ে সবাই সমানে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, কোথায় যেন একটা জ্যাম লেগে আছে। জ্ঞান নিয়ে সবাই পথে নামার কারণে সম্ভবত ‘জ্ঞানের জ্যাম’ লেগে গেছে। এই জ্যামটা দূর করা যাচ্ছে না।
সবকিছুর যেমন মেরিট-ডিমেরিট আছে, জ্ঞানেরও আছে। আমরা ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি, ইনফরমেশন ইজ নলেজ অ্যান্ড নলেজ ইজ পাওয়ার। অর্থাত্ তথ্যই জ্ঞান আর জ্ঞানই ক্ষমতা। আমাদের দেশে অবশ্য তথ্য তার গুরুত্ব হারিয়েছে। এদেশে গুজব, রটনা, কুসংস্কার, মিথ্যে-বানোয়াট-মনগড়া মন্তব্যই হচ্ছে তথ্য। এসব চর্চা ও অনুশীলনে যারা সিদ্ধহস্ত, তারাই ক্ষমতাবান। আর ক্ষমতা মানেই আমাদের দেশে বিরাট কিছু। একবার ক্ষমতাবান হয়ে গেলে ‘মুই কি হনু রে’ ভাব চলে আসে। তারা তখন অন্যের মতামতের মূল্য দেয় না। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের কথা তো বলাই বাহুল্য, এর বাইরে ক্ষমতাবান শিক্ষক শিক্ষার্থীর কথা শুনতে চান না, ক্ষমতাবান মালিক-কর্মচারীর মত জানতে চান না, ক্ষমতাবান পুরুষ সঙ্গিনীর মন বুঝতে চান না। তারা সবাই যে ব্যক্তি হিসেবে স্বৈরতন্ত্রী, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। সমস্যাটা ব্যক্তির নয়, ক্ষমতার। ক্ষমতা স্বভাবত বধির, একই সঙ্গে বেপরোয়াও। সে কেবল বলতে চায়, নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করতে চায়; অন্যের মত জানতে চায় না, শুনতে চায় না। ক্ষমতাবান নায়ক যখন গলার শির ফুলিয়ে চিত্কার করে বলেন, ‘আমি যা বলেছি, তা-ই হবে’, কিংবা নির্মম নীরবতায় বুঝিয়ে দেন তার স্পর্ধিত অবজ্ঞা, তখন ক্ষমতার দাপটে নৈতিকতা পালিয়ে যায়। নৈতিকতা অবশ্য আলাদা জিনিস। আমাদের দেশে ওর সঙ্গে জ্ঞানের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।
তাই বলে বলছি না যে, আমাদের দেশে কোনো সমস্যা নেই। আমাদেরও সমস্যা আছে। আমরা অন্যের কথা শুনি না, অন্যের কাছে জানতে চাই না। কেবল নিজের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য জাহির করতে চাই। আমরা ভুলে যাই জ্ঞানের ভুবনে আমরা কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। অপরে যা জানে আমি তার অনেক কিছুই জানি না, তাই অপরের কাছে আমার জেনে নেওয়ার সুযোগ কখনো ফুরোয় না। এই সুযোগ যদি কাজে লাগাতে চাই, তাহলে আগে নিজের না-জানা সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। সেই সচেতনতা থেকেই তৈরি হতে পারে অন্যের কাছে জেনে নেওয়ার তাগিদ। এ এক পারস্পরিক লেনদেন, যার কোনো শেষ নেই। মূলত এ এক সমবেত অভিযাত্রা। যেন আমরা সবাই নিজের নিজের প্রদীপ হাতে নিয়ে পথ চলেছি, প্রত্যেকেরই নিজের প্রদীপের আলোটুকুর বাইরে বিস্তীর্ণ এলাকা, অন্ধকার, কিন্তু আমরা সেই অন্ধকার এলাকা সম্পর্কে সচেতন, ঐ আলোটুকু আছে বলেই সচেতন। সচেতন বলেই, যদি চাই, একে অন্যের প্রদীপে আলোকিত এলাকাগুলোকেও দেখে নিতে পারি, আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়েই প্রসারিত হতে পারে আমাদের যৌথ আলোকায়ন, সমৃদ্ধ হতে পারে আমাদের সমবেত জ্ঞানের ভুবন।
ক্ষমতাহীনের কথা না শোনার অভ্যেস ক্ষমতাবানের জ্ঞানকেও অগভীর, অসম্পূর্ণ করে, বাস্তবের মোকাবিলায় তাকে ব্যর্থ করে দেয়। এই ব্যর্থতার অগণিত দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকে, আমরা চিনতে পারি না, কারণ আমাদের দৃষ্টিপথ নিজের প্রদীপের আলোতেই সীমিত থাকে।
সমাজের চোখে কে জ্ঞানী এবং কে অজ্ঞ, সেই ধারণা সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসেরই সৃষ্টি। অতএব, কারা জ্ঞান দেবে এবং কারা জ্ঞান নেবে, তার প্রচলিত ছক ভেঙে দেওয়ার সূত্র ধরেই আমরা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি সেই আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটিকে, যা এ ছকটিকে সৃষ্টি ও লালন করে। আর, এই প্রতিস্পর্ধার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যেতে পারি বৃহত্তর ও গভীরতর সামাজিক ন্যায়কে প্রসারিত করার অভিযানে। এই ভাবে দেখলে, সামাজিক ন্যায়ের লক্ষ্য পূরণের একটি প্রাথমিক শর্ত হয়ে ওঠে শোনা, বোঝা। বিশেষত, ক্ষমতাবানের।
এসব তত্ত্বকথা থাক। মূল কথা হচ্ছে, যারা বৈশ্বিক জ্ঞানসূচকের এই তালিকা প্রণয়ন করেছেন, আমাদেরকে নিচের সারিতে রেখেছেন, আমরা তাদের নিন্দা জানাই। তারা আসলে আমাদের পাঠ করতে ভুল করেছেন। অথবা আমাদের যে জ্ঞান আছে, আমরা প্রত্যেকেই জ্ঞানের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি, এদেশে জ্ঞানী লোকের সংখ্যা যে শেয়াল-শকুনের চেয়েও বেশি—তা বোঝার মতো জ্ঞান তাদের হয়নি। তাই তো এমন একটা অবজ্ঞামূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
এই প্রতিবেদনটা সাংঘাতিক! প্রতিবেদন-প্রণেতারা আমাদের ‘অজ্ঞান’ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। জ্ঞানহীনতাকে সাধারণত অজ্ঞানতা বলা হয় (যেমন, হঠাত্ কোনো ব্যক্তি মূর্ছা গেলে বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাকেও অজ্ঞান বলা হয়ে থাকে)। তার মানে কি আমরা সামষ্টিকভাবে সংজ্ঞাহীন? তা ছাড়া জ্ঞান হচ্ছে জীবনের সেই চালক—যাকে চোখে দেখা যায় না। আর যা চোখে দেখা যায় না, সেই জিনিস আছে কি নেই, সেটা অন্তর্যামী ছাড়া কে বোঝেন? এই নলেজ ইনডেক্স তৈরি করা, সেই ইনডেক্সে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচের সারিতে রাখা—এ সবই আসলে ষড়যন্ত্র। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার আন্তর্জাতিক অপপ্রয়াস!
পুনশ্চ : সুকুমার রায়ের ‘ষোল আনাই মিছে’ কবিতাটির কথা মনে আছে? কবিতায় বিদ্যার ভারবাহী এক পণ্ডিত নৌকায় চড়ে মাঝির জ্ঞানের পরীক্ষা নেন। সূর্য কেন ওঠে, জোয়ার-ভাটা কেন হয়, পাহাড় থেকে কেন নদীর ধারা নেমে আসে, চন্দ্রগ্রহণ কেন হয় ইত্যাদি প্রশ্নবাণে মাঝিকে জর্জরিত করেন পণ্ডিত। বেচারা মাঝি উত্তর দিতে পারেন না। পণ্ডিত তাকে তিরস্কার করে বললেন, তার জীবনের বারো আনাই ব্যর্থ। হঠাত্ ঝড় ওঠে। ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকা ডোবার উপক্রম। মৃত্যুভয় গ্রাস করে পণ্ডিতকে। নিরক্ষর মাঝি পণ্ডিতের কাছে জানতে চায়, সে সাঁতার জানে কি না। পণ্ডিত সাঁতার জানতেন না। মাঝি তখন বলেন, ‘তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে!’
কাজেই কে জ্ঞানী আর অজ্ঞানী তা নির্ণয় করা সহজ কাজ নয়।
যারা এই তালিকা প্রণয়ন করেছেন, তারা যদি একবার বাংলাদেশে এসে ফেসুবক-টুইটার-হোয়াটসঅ্যাপ, টিভি, রেডিও, পত্রিকায় আমাদের জ্ঞানের প্রকাশ দেখতেন, সবজান্তা শমসেরদের লেখা পড়তেন বা আলোচনা শুনতেন, তাহলে নলেজ ইনডেক্সে নিশ্চিত করেই আমাদের নাম সবার উপরে রাখতেন!
n লেখক : রম্যরচয়িতা