এ এক অপরূপ বিস্ময়!

পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ইতিহাস বলে, বাঙালি জাতি স্বপ্নের সঙ্গে কখনো আপস করেনি। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর  পদ্মা সেতুর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানো হয়। এক একটি স্প্যান বসানোর সঙ্গে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে থাকে। গত ১০ ডিসেম্বর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান বসানোর মাধ্যমে স্বপ্ন ডানা মেলেছে। দেশের সর্ববৃহত্ এই প্রকল্পে ৯০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের শুরুর দিকে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। পরনির্ভরশীলতার পরাকাষ্ঠায় আবদ্ধ এক সময়ের বাঙালি জাতি সবসময় চেষ্টা করেছে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার। তার সর্বশেষ উদাহরণ নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণ চ্যালেঞ্জের হলেও কখনো আশা হারায়নি বাংলাদেশ। বিশ্বের গভীরতম পাইলের সেতু ‘পদ্মা বহুমুখী প্রকল্প’। করোনাকালের মধ্যেও কাজ অব্যাহত রাখায় স্বপ্নের সেতু বাস্তবে রূপ পেয়েছে।

বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গৌরবকে মহিমান্বিত করার নাম পদ্মা সেতু। এটা চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তো বটেই, পুরো দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে। পদ্মা সেতুর ওপারে সংযোগ সড়ক ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে তিন দিকে তিনটি মহাসড়ক খুলনা, বরিশাল, রাজবাড়ী ও যশোরের দিকে চলে গেছে। যা মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ বেনাপোল স্থলবন্দরকে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন  প্রক্রিয়ায় সক্ষমতার স্বরূপ তুলে ধরেছে পদ্মা সেতু। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নয়, পুরো দেশের সঙ্গে একটা সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে এর মাধ্যমে। কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য-শিক্ষা-অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। এ সেতুর মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য আরো গতিশীল হবে। পদ্মার দুপাড়ে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গড় দূরত্ব কমে যাবে। সময় ও অর্থ সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি আমদানি ও জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটনশিল্পের বিকাশ লাভে পদ্মা সেতু ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। আরো বিশদভাবে বলতে গেলে বলতে হয়—পদ্মা সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ অর্থনীতির ধনাত্মক পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসবে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের গতি সঞ্চারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাবে। পদ্মা সেতুর বিশেষত্ব হলো—এটি দ্বিতল। সড়ক ও রেলপথ মিলিয়ে একসঙ্গে চিন্তা করলে পদ্মা সেতু বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বৃহত্ সেতুগুলোর একটি।

উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ভালো দিকের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর কিছু নেতিবাচক প্রভাব সবসময় পড়ে! পদ্মা নদীর ভাঙা-গড়ার খেলা প্রায় সময় চলমান থাকে। পদ্মার বুকে এত বড় সেতু নির্মাণের ফলে পলি পড়তে পারে। যার ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ঋণাত্মক প্রভাব পড়া বিচিত্র নয়। নদীর প্রবাহ যাতে সচল থাকে, সেজন্য এখনই পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে বিশ্বে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বুকভরা গর্ব আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে বাঙালি জাতি এখন বলতে পারবে—আমরাও পারি! পদ্মা সেতু নির্মাণ যেন স্বপ্নের সঙ্গে আপস না করা এক জয়ের গল্প। টুকরো টুকরো স্বপ্নের পালে হাওয়া দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সর্বক্ষেত্রে এভাবেই মর্যাদার আসনে আসীন হবে।

ঢাকা