সুমিত বণিক
বর্তমান বিশ্বে নারী পুরুষের সমতা একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গড়ার অন্যতম অনুষঙ্গ। এই সমতাপূর্ণ সমাজের ব্যাখ্যা নিয়ে আমাদের সমাজে রয়েছে ধুম্রজাল। পৃথিবীর মানুষ সভ্যতার আলো পেয়েছে, সে অনেক যুগ হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ নিজের প্রতিভাকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এখনো আমাদেরকে ভাবতে হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতার মতো অমানবিক বিষয় নিয়ে। আমাদের মানসিকতায় এখনো অনেক দীনতা রয়ে গেছে। সেটা হলো নারীকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবার ক্ষেত্রে! নারীর অধিকার মানে মানবাধিকার, নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না—এই সহজ কথাটাই আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারী এবং মেয়েরা নানা মাত্রার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই বছর, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কিত দুটি যুগান্তকারী আইনের বার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, নারী এবং মেয়েরা প্রায়শই এই আইনের অধীনে অর্থবহ আইনি প্রতিকারের সন্ধান করতে পারেন না এবং নির্যাতনকারীদের খুব কমই বিচারের আওতায় আনা যায়। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মাল্টি-সেক্টরাল প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্য অনুসারে, নারী ও মেয়েদের জন্য সরকারের নয়টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কোনো একটির মাধ্যমে আইনি মামলা দায়ের করা ১১,০০০-এরও বেশি নারীর মধ্যে কেবল ১৬০টি ঘটনায় সফলভাবে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে—যা প্রায় এক শতাংশ।
বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক জরিপে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৭টি জেলায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ৪২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬টি শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। বাল্যবিবাহ হয়েছে ৩৩টি। ২৪টি সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ২৭ জেলার ৫৮ উপজেলার ৬০২টি গ্রাম ও ৪টি সিটি করপোরেশনের ১৭২০৩ জন নারী ও শিশুর সঙ্গে মোবাইলফোনের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার ২০০৮, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩০৮ জন নারী। এর বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চারজন নারী, হত্যা করা হয়েছে একজনকে এবং যৌন হয়রানি করা হয়েছে ২০ জন নারীকে।
এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা একটি মারাত্মক ব্যাধি। এ ব্যাধি থেকে সমাজ, দেশকে মুক্ত করতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জন। এসব অধিকাংশ ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয় না, অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বিচারহীনতার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। একটি ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর আমরা প্রতিবাদে সোচ্চার হই। প্রশাসন সক্রিয় হয়। অথচ অসংখ্য ঘটনা ফেসবুক কিংবা গণমাধ্যমের আড়ালে থেকে যাচ্ছে, আমরা জানতেও পারছি না। তাই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আশার কথা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ‘আমাদের জীবন, আমাদের স্বাস্থ্য, আমাদের ভবিষ্যত্’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার কিশোরী ও যুবতী নারীকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে নারীদের এসব বিষয়ে জীবন দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সহিংসতামুক্ত সহায়ক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই সামাজিক ব্যাধির উত্তরণে আসুন, জেগে উঠি, সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি।
ঢাকা