সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে যা প্রয়োজন

নীলকণ্ঠ আইচ মজুমদার

সামাজিক অস্থিরতা এত বেড়েছে যে মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একেক শ্রেণি গোষ্ঠী দ্বারা একেক রকম সামাজিক সমস্যা তৈরি হলেও তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সমাজের সব স্তরের মানুষকে। সমস্ত সামাজিক অপকর্ম মাথাচাড়া দেওয়ার পিছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে দুর্নীতি। আর মানুষ দিনকে দিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এসব সামাজিক সমস্যা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। মানুষ নিজকে নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, সামাজিক দায়ববদ্ধতার জায়গাটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে।

মানুষের মাঝে সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরির জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরালো করার যে প্রযোজনীয়তা রয়েছে সেক্ষেত্রে সামাজিকভাবে আমরা সবাই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কেবল ঘরে বসে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছি। তাও আবার ভালোর দিকটা নেহায়েতই কম।

জারি, পালা, যাত্রা, মাঠের খেলা, নৌকাবাইচ, মঞ্চ নাটক, বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে মানুষের অংশগ্রহণ কম। এখন অনুষ্ঠান হয় তবে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রংমাখানো প্রাণহীন। কয়েক যুগ আগে পাড়ায় মহল্লায় লাইব্রেরি দেখা গেলেও বর্তমানে লাইব্রেরি গ্রামেগঞ্জে চোখে পড়ে না। তারপরও জীবন জীবনের নিয়মে চলে যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সামাজিক বন্ধনের অভাবে তৈরি হচ্ছে পারিবারিক বন্ধনহীনতা।

গ্রামেগঞ্জে সামাজিক কর্মকাণ্ড এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো ভুলেই যাবে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলে কিছু ছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়া এবং আধুনিক আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমরা আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে ভুলে যাচ্ছি। অর্থনৈতিকভাবে যতই সফলতা অর্জন করি না কেন, যদি সামাজিক ভিত্তি মজবুত করা না যায় তবে পাওয়া যাবে না আধুনিকতার সুফল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এদিকে ফেরাতে হবে। আধুনিক যুগের চাহিদা মেটাতে মানুষ যেভাবে মোবাইলফোনে আসক্ত হয়েছে—সেটা থেকে বের করে আনতে হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো জরুরি।

একসময় মাঠে খেলাধুলার সময় বিভিন্ন গান বাজনা চলত সামাজিকভাবে। আর এসব অনুষ্ঠানে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বেশ সরব। সামাজিক অনুষ্ঠানে সময় ব্যয় করায় বিশেষ করে কিশোর বয়সের ছেলেরা বিপদগামী হওয়ার সুযোগ পেত না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব কর্মকাণ্ড গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ হয়ে পড়েছে কর্মব্যস্ত। দেখে মনে হয় যেন প্রত্যেকে একটা টাকার মেশিন! বাবা ছেলে, ভাইয়ে ভাইয়ে, মা ছেলে, আত্মীয় স্বজন একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়াচ্ছে। একটা সময় সমাজব্যবস্থায় বয়স্কদের প্রতি যে মান্যতা ছিল তা আজ চোখে পড়ে না। সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে মুরুব্বিদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। যার ফলে অনেক সমস্যাই সামাজিকভাবে সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সামাজিক অনাচার মানুষের এসব গুণকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে প্রতিনিয়ত। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় সামাজিকব্যবস্থার ভিতটা শক্ত থাকলেও বিগত কয়েক বছরে খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়ে আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে পারলে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

ময়মনসিংহ