কুষ্টিয়ায় এবার বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর

কুষ্টিয়ায় এবার বিপ্লবী বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার রাতে কে বা কারা জেলার কুমারখালী উপজেলার কয়া কলেজের প্রধান ফটকের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে। গতকাল শুক্রবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এদিকে তথ্য ও ঘটনার ক্লু উদ্ধারে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি, অধ্যক্ষ, নৈশপ্রহরী ও যুবলীগ নেতাসহ চার জনকে আটক করে নেওয়া হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্র জানায়, কুমারখারী উপজেলা সদর ৮ কিলোমিটার দূরে বাঘা যতীনের বাস্তুভিটা এলাকায় কয়া মহাবিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় যোদ্ধা বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। কুমারখালী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৬ সালে বাঘা যতীনের আবক্ষ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। দুর্বৃত্তরা রাতের অন্ধকারে এ ভাস্কর্যটির নাক ভেঙে ফেলে। এছাড়া মুখমণ্ডলের ক্ষতি করে।

গত ৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মানাধীণ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের এ দ্বিতীয় ঘটনা ঘটল। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙচুর হওয়ায় কয়া কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ  ঘটনার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তবে মৌলবাদী চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে।

 তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, বাঘা যতীনের নামে কয়া কলেজের নামকরণ নিয়ে বিরাজমান দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণেও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটতে পারে। এদিকে তথ্য ও ক্লু উদ্ধারে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিজামুল হক চুন্নু, কলেজের অধ্যক্ষ হারুন-অর-রশিদ, নৈশপ্রহরী খলিলুর রহমান খলিল ও কয়া ইউপি যুবলীগের সভাপতি আনিসুর রহমান আনিসকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম স্বপন জানান, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর বাঘা যতীনের ভাস্কর্য চত্বরে বৈদ্যুতিক বাতি সংযোগসহ নিরাপত্তা কর্মীর নজরদারি জোরদার করতে কলেজের অধ্যক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বিষয়টি কেন গুরুত্ব দেননি তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

কয়া কলেজের অধ্যক্ষ হারুণ-অর-রশিদ জানান, রাতের অন্ধকারে কে বা কারা ন্যক্কারজনক এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভাস্কর্য ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। 

কুমারখালী থানার ওসি মজিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তদন্তে মাঠে নেমেছে। যারাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক তাদের কোনো রেহাই নেই বলে তিনি জানান।

কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীবুল ইসলাম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে পুলিশ তদন্ত কাজ শুরু করেছে বলে তিনি জানান।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন।

ঘাতক দালাল নির্মূল

কমিটির নিন্দা

কুমারখালীর কয়ায় ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামের মহানায়ক শহিদ বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে ভাস্কর্য ভাঙার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের এবং এদের প্ররোচক ও নির্দেশদাতাদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবি জানিয়েছে। গতকাল সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানায়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপি-জামায়াতের মদতে হেফাজত-খেলাফতের জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসী নেতারা সারা দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিয়ে যেভাবে ওয়াজের নামে সন্ত্রাস ও উন্মাদনা ছড়াচ্ছে তারই ধারাবাহিকতায় কুমারখালীতে অগ্নিযুগের এই বিপ্লবীর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘সংবিধানের ২৪ ধারায় ভাস্কর্যসহ বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির ‘ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাত্পর্যমণ্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু ও স্থানগুলোর বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ’ থেকে রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেওয়া হলেও সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা সংবিধানের ২৪ ধারা লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার জন্য নতুন আইন প্রবর্তনের দাবি জানাচ্ছি।