অনিয়মে রাজস্বও বঞ্চিত করে

দেশে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িতেছে। ইহার সহিত বাড়িতেছে রাস্তায় শৃঙ্খলার অনিয়মও। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, দেশে এক জন দুই জন অথবা শতকরা এক-দুই জন নহে, গাড়িচালকদের মধ্যে সাড়ে সাত লক্ষের লাইসেন্স নাই! দেশে নিবন্ধিত যানবাহন রহিয়াছে প্রায় ৪৫ লক্ষ, অথচ তাহার বিপরীতে বৈধ চালক লাইসেন্সধারী রহিয়াছেন ৩৭ লক্ষের কিছু বেশি। অর্থাত্ বৈধ কাগজ ছাড়াই সাড়ে সাত লক্ষ চালক দাপাইয়া বেড়াইতেছেন রাস্তায়। কী করিয়া সম্ভব! রাস্তায় বাহির হইলেই দেখিতে পাওয়া যায় ট্রাফিক পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ সার্জেন্টরা এখন রাস্তায়। অথচ তাহাদের সম্মুখেই কাগজপত্রবিহীন, প্রশিক্ষণবিহীন, ন্যূনতম শিক্ষাবিহীন চালকরা কী করিয়া পথে নামে তাহা ভাবিতেও বিস্মিত হইতে হয়। ফলাফল কী দেখিতেছি আমরা? পুলিশের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যানেই বলা হইয়াছে, ৮৬ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ বেপরোয়া গতি। আর ওভারটেকিংয়ের কারণে আরো ৪ শতাংশের কিছু বেশি দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। অর্থাত্ মোট ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক। প্রশ্ন হইল, কেন তাহাদের নিয়ম মানিয়া লাইসেন্স দিয়া রাস্তায় নামার ব্যবস্থা করা হইতেছে না? ইহার খানিকটা কারণ যে আমরা জানি না তাহা নহে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখিয়া থাকি, নিয়মের বাহিরের কাজ-কারবারই ঘুষ-দুর্নীতি অসত্ পয়সার প্রধান উত্স। যেইখানে অনিয়ম আছে, সেইখানে উেকাচ লেনেদেনের বিষয় থাকে। জটিল সমীকরণ নহে: লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় থাকা চালকরা কাহাকেও না কাহাকে সন্তুষ্ট করিয়া থাকে। হয়তো সেই কারণেই লাইসেন্সবিহীন চালকদের নিয়মের পথে হাঁটিতে বাধ্য করা হয় না। অথচ এই চালকদের লাইসেন্স থাকিলে সরকার একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের রাজস্ব পাইত। ইহার পাশাপাশি ঐ চালকরাও স্বচ্ছন্দে গাড়ি চালাইতে পারিত, রাস্তায় ভয় লইয়া চলিতে হইত না। তাহাদের জীবনমানেও আসিত পরিবর্তন। সুতরাং ভূত কিন্তু সরষের মধ্যেই রহিয়াছে। ইহা  বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি পূর্বের তুলনায় বেশ খানিকটা জাবাবদিহির মধ্যে আসিয়াছে। ইহার সহিত অথরিটির কার্যক্রম অনেকাংশে ডিজিটাল হইয়া যাওয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্তি সহজতর হইয়াছে। বর্তমানে স্মার্ট কার্ডে লাইসেন্স দেওয়া হইয়া থাকে। লাইসেন্সের জন্য দীর্ঘকাল অপেক্ষা করিবার দিনও এখন নাই। তাহার পরও যে কারণে অনিয়ম ঘটিতেছে, সেই কারণটি দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে কত সময় লাগিবে উহা কিন্তু এখনো আমাদের নিকট অজানাই রহিয়া যাইতেছে।

শুধু যানবাহনচালকদেরই নহে, দেশে অনেক ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিরই অবলম্বন করা হইতেছে, যাহাতে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে সরকারের রাজস্ব আদায় এবং প্রতিষ্ঠা পাইতেছে না আইনের শাসন। যেমন ঢাকা শহরে মেয়রদ্বয় যথেষ্ট চেষ্টা চালাইতেছেন অবৈধ দখলদারমুক্ত রাজধানী গড়িবার নিমিত্তে; কিন্তু  দেশব্যাপী এই রকম অবৈধ দখল রহিয়াছে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ। ঐ সকল ক্ষেত্রে খোঁজ নিলেই দেখা যাইবে, অবৈধ স্থানে যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি মুদি দোকানটি চলিতেছে, সেইখান হইতে কেহ না কেহ টোল আদায় করিতেছেন। 

যে কোনো সমস্যা নির্মূল করিতে হইলে তাহার শেকড় উপড়াইয়া ফেলিতে হয়। ডালপালা ছাঁটিতে চেষ্টা করিলে পণ্ডশ্রম হইবার সম্ভাবনা থাকে। কারণ ডাল ছাঁটিলে আবার তাহা নূতন করিয়া গজায়। সুতরাং লাইসেন্সজনিত সমস্যা মিটাইতে হইলে রাস্তায় উেকাচ কালচার উপড়াইয়া ফেলিতে হইবে। ইহাতে সরকারও উপকৃত হইবে, রাস্তাও নিরাপদ হইবে।