করোনায় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি

মুমতা হেনা মীম

‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’—এ কথাটিই যেন বিশ্ববাসীকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল মহামারি করোনা। এ করোনাকালে বিশ্ব জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ায় পালটে গেছে জীবনব্যবস্থা, থমকে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি। বাংলাদেশেও চলতি বছরের মার্চ থেকে করোনার ভয়াবহতা লক্ষ্য করা গেছে। হঠাত্ এমন মহামারির আগমনে বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন।

এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছে ৪ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ। মৃত্যু হয়েছে ৭ সহস্রাধিক জনের। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে সাধারণ ছুটি ঘোষিত হলেও বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দিনমজুরসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেও হঠাত্ করেই ধস নেমেছিল। হঠাত্ উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী ছাঁটাই আর ৮ লাখ প্রবাসী কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরার কারণে বৃদ্ধি পায় বেকারত্ব। প্রবাসফেরত এবং দিন এনে দিন খাওয়া উভয় জনগোষ্ঠীই নিজেদের জমানো সঞ্চয় খরচে বাধ্য হয়।

 সাধারণ ছুটির প্রথম মাসেই দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যার দৈনিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

 লকডাউন তুলে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। করোনার প্রথম আঘাতের স্থবিরতা কাটিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠছিল রফতানি খাত। কিন্তু অক্টোবরেই আবার দ্বিতীয় আঘাত শুরু হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ক্রেতারা ক্রয়াদেশের লাগাম টেনে ধরতে শুরু করে। ফলে ফের কমছে রপ্তানি। যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের অর্থনীতিতে। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, ভবিষ্যতে অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তার চাইতে বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমানে দেশের জনগণের স্বাস্থ্য কতটা ঝুঁকির মুখে?

সুস্থ-সবল জনশক্তি ব্যতীত উন্নত অর্থনীতি কল্পনাতীত। একটি দেশের উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো ভালো ফলাফলের দিকে নিয়ে যেতে পারে। দেশের জনগণ তথা শ্রমিক কতটা সুস্থ, কর্মঠ? ও উত্পাদন ক্ষমতার অধিকারী, তা সে দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। আবার তার ওপর নির্ভর করে সে দেশের অর্থনীতির চাকা। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায় যে, একজন রুগ্ণ শ্রমিকের থেকে সুস্থ শ্রমিকের কর্মক্ষমতা অনেক বেশি এবং জাতীয় পর্যায়ে তার অবদানও বেশি। অর্থনীতির একটি বিশেষ শাখা স্বাস্থ্য। অর্থনীতিতে স্বাস্থ্যকে একটি অন্যতম চলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেখানে দেখানো হয় যে, জনগণের স্বাস্থ্যই অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

উন্নয়নশীল দেশে আমরা এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে থাকি। শ্রমনির্ভর উত্পাদনব্যবস্থায় জনগণের স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জনগণের উত্পাদনক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যই প্রধান ভূমিকা রাখে।

দেশের ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্—যে কোনো শিল্পের উত্পাদনপ্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ শ্রম প্রচুর অবদান রাখে। এই শ্রমশক্তির সিংহভাগ দরিদ্র এবং অতি-দরিদ্র শ্রেণির অন্তর্গত এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত এবং জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মহামারির এ পরিস্থিতিতে তাদের আয় হ্রাস পেয়েছে। এতে তারা পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারছে না ফলে অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। অবিলম্বে তৃণমূল পর্যায় থেকে মোকাবিলা করতে না পারলে আমাদের বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ সময়ে শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যে নয়, প্রভাব পড়েছে মানসিক স্বাস্থ্যেও। অসুস্থতা, জনবিচ্ছিন্নতা, প্রিয়জন হারানোর শোক, উত্কণ্ঠা-উদ্বেগ, আয় হ্রাস, বেকারত্বের কারণে সৃষ্টি হয়েছে স্নায়ুবিক এবং মানসিক সমস্যা। বহু মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজ-অর্ডারে ভুগছে। এসব সমস্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়বে উত্পাদন ব্যবস্থায়। সেজন্য এখনই এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ না করলে ফলাফল হবে খুবই ভয়ানক।

শীতজনিত কারণে বিশ্বের অনেক দেশে আবারও বাড়ছে সংক্রমণ। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে আবারও লকডাউন দিয়েছে।

বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বিঘ্নিত হবে উত্পাদন, হুমকির মুখে পড়বে অর্থনীতি। এজন্য অবশ্যই আমাদের আগামী দিনের পরিবেশ নিয়ে সচেতন হতে হবে, দ্রুত করোনা মোকাবিলার সঙ্গে পরিবেশের অবক্ষয়কে মোকাবিলা করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্য খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই সব মানুষের স্বাস্থ্য, জীবন-জীবিকা রক্ষা এবং সব ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়