স্বপ্নগুলো পড়ে থাকলো রেললাইনের ওপরেই

ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলোনা মঞ্জুরুল ইসলাম নাসিমের। গতকাল শনিবার ভোরে জয়পুরহাটের পুরানাপৈল রেলগেট এলাকায় রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন ও বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণ হারানো ১২ জনের একজন ছিলেন নাসিম। তিনি জেলার পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা গ্রামের মৃত মোশারফ হোসেন মজনুর ছেলে। 

মা সিদ্দিকা বেগম জানান, স্বামী মোশারফ হোসেন মজনু এক বছর আগে মারা গেলেও দুই ছেলে মেহেদী হাসান ও মঞ্জুরুল ইসলাম নাসিমকে নিয়ে অনেক অভাব অনটনে চলতো সংসার। ছোট ছেলে নাসিম রাজশাহী রুয়েট থেকে ২০১৬ সালে পাশ করে সোনালী ব্যাংকে চাকরি পাওয়ায় অনেকটা অভাব কেটে যায়। বর্তমানে সে হিলি হাকিমপুর শাখায় সিনিয়র অফিসার হিসাবে কিছুদিন আগে যোগদান করে। এরমধ্যে গত বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে অংশগ্রহণ করে কৃতকার্য হয়। চলছে ভাইভা দেওয়ার প্রস্তুতি। ভাইভা দেওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে নাসিম ঢাকা যায় এক সপ্তাহ আগে। বন্ধুদের সঙ্গে ভাইভার পরামর্শ নিয়ে পঞ্চগড় আন্তঃনগর ট্রেনে জয়পুরহাট স্টেশনে নেমে বাড়ি ফেরার জন্য শনিবার সকালে ওই বাসে ওঠে। বিধিবাম ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন তো দূরের কথা শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে হলো লাশ হয়ে। 

প্রতিবেশী আজাদ আলী জানান, মাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে  পাচ্ছেন না। 

অপরদিকে একই উপজেলার আটুল গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আলতাফ আলীর দুই ছেলে সারোয়ার হোসেন বাবু ও আরিফুল ইসলাম রাব্বীও ট্রেন বাস দুর্ঘটনায় মারা যায়। বড় ভাই বাবু পশু চিকিৎসক হিসাবে কাজ করেন। ছোট ভাই রাব্বী মেধাবী হওয়ায় ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্নে ভাইকে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ( টেক্সটাইল) এ ভর্তির কাজ শেষ করে ট্রেন থেকে জয়পুরহাটে নেমে দুই ভাই ওই বাসে ওঠেন বাড়ি ফেরার জন্য। কিন্তু তাদের আর বাড়িই ফেরা হয়নি।

পিতা আলতাফ আলীর দুই ছেলেই ছিল সম্পদ। আর অন্য কোনো সন্তান নেই তাদের। পারিবরিক কবরস্থানের জন্য সাত শতক জায়গা কিনেছেন কিছুদিন আগে। সেখানে নিজের কবর রেখে দুই ছেলের কবর দিতে হলো আগে- এমন করেই বিলাপ করছিলেন তিনি। 

এদিকে, রেলপথ সচিব সেলিম রেজা শনিবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলামসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও রেলওয়ের জিএম মিহিরি কান্তি গুহসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় দুর্ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা গেটম্যান নয়ন ইসলামকে বরখাস্ত করার আদেশ দেন রেলপথ সচিব সেলিম রেজা। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র রায়।

উল্লেখ্য, শনিবার সকালে জয়পুরহাটের পুরানাপৈল রেলগেট এলাকায় হিলিগামী যাত্রীবাহী বাসকে রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেন ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়, লাইনচ্যুত হয়ে ট্রেনটি।  দুর্ঘটনাস্থলে ১০ জন এবং বগুড়া মেডিকেলে নেওয়ার পথে আরো দুইজন মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়।  এ ঘটনায় আহত তিন জনের অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো। মরহেদগুলো পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবির। দুর্ঘটনা তদন্তে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন তদন্ত কমিটি। 

ইত্তেফাক/এসি