বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

 

মাধব রায়

গল্পকার-প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক

 ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

 

এই মহাবীরের জন্ম ফরিদপুর জেলার সালামতপুর গ্রামে, ১৯৪৩ সালের ৮মে এক দরিদ্র পরিবারে। পিতা মুন্সি মেহেদী হাসান চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন। তিনি মসজিদে ইমামতি করেও আয় করতেন। মা মোসাম্মত্ মকিদুন্নেসা কিছুটা লেখাপড়া জানতেন। মীর মোশাররফ হোসেন এর বিষাদসিন্ধু তিনি তিনবার পড়েছিলেন।

মুন্সি আব্দুর রউফ-এর বড় দুই বোন ছিল। জহুরা এবং হাজেরা। রউফকে মা আদর করে ডাকতেন রব বলে। দামাল প্রকৃতির ছেলে ছিল রব। লেখাপড়ায় ভালোই ছিল, কিন্তু সমস্যা হলো পড়াশুনায় মন বসে না। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াতেই রবের আনন্দ। এই নিয়ে মায়ের মনে দুঃখ। ছেলেকে বকাঝকা করেন, দুরন্তপনার জন্য।

মধুমতী নদীর তীরে ছিল মুন্সি আব্দুর রউফদের বাড়ি। মা বকাঝকা করলে নদীর তীরে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে থাকত ছেলে। একদিন মা তাকে পড়তে বসাতে চেষ্টা করলেন। ছেলে কিছুতেই বসবে না। মা রেগে উঠলে দৌঁড়ে পালাল দুষ্ট ছেলে। মা-ও ছুটলেন। একেবারে নদীর তীরে। মা পিছনে পিছনে। ছেলে মাকে ভয় দেখাল-ধরতে এলে নদীতে ঝাপ দেব। দুরন্তপনার কাছে মা পরাস্ত হলেন। পড়ার জন্য মা-কি ছেলেকে নদীতে ঝাপ দেবার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মধুমতী নদীর ছিল ভাঙ্গাগড়ার দোষ। এপাড় ভাংতে গিয়ে ওপার গড়ে। সেই স্বভাবদোষে সালামতপুর গ্রামবাসীর বাড়ি ঘর, চাষের জমি সবটুকুই গ্রাস করে নিলো রাক্ষুসী নদী। মেহেদী হাসানের জমিজমাও সেই গ্রাসে চলে যায়। সংসারে অভাব দেখা দেয়, অনেক কষ্ট হয় সংসার চালাতে। এমনি করেই হঠাত্ একদিন পরলোক গমন করেন পিতা মেহেদী হাসান।

দুই মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে অকুল সমুদ্রে পড়েন মাতা মকিদুন্নেসা। ছেলেমেয়েদের মানুষ করা দূরের কথা, বেঁচে থাকার জন্য খাবার দাবার জোগাড় করাটাই তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। তিনি একটু একটু লেখাপড়া জানতেন। সূচি কাজ শুরু করলেন। গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন মানুষের কাঁথা সেলাই করে দিতেন, পাট দিয়ে শিকা বানিয়ে বিক্রি করে কিছুটা আয় রোজগার করতে শুরু করলেন। আর পিতার মৃত্যু বালক রউফ এর মনে এতটা ছায়াপাত করল যে, সে দস্যিপনা থেকে ফিরে এসে পড়াশুনায় মন দিয়ে দিলো। তখন তার বয়সই বা কত, মৃত্যু বিষয়টা উপলব্ধি করার মতো জ্ঞানই তার হয়নি। চাদরে আবৃত পিতার মরদেহ দেখে সে তো বুঝতেই পারেনি কী ঘটেছে। পাড়া প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজনদের কান্না দেখে জিজ্ঞেস করে সেই অবোধ বালক, ‘মা, বাবা কি সত্যিই মরে গেছে?’ মা কী জবাব দেবেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে আরও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। যাই হোক, ছেলে পড়াশুনায় মন দিলে মা-এর একটু স্বস্তি ফিরে এলো। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র হয়ে উঠল সেই ছেলে।

সেই অভাব অনটনের মধ্যেই একদিন তার বড় বোন জহুরার বিয়ে হয়ে যায়। তখন এই পরিবারের আর্থিক দৈন্যতা এতটাই ছিল যে, সেই বিয়েতে একটা নতুন কাপড়ও দেয়া সম্ভব হয়নি। কিশোর রউফ মাকে বলেছিল, মা, আমি বড় হলে চাকরি করে সবার জন্য অনেক নতুন শাড়ি কিনে আনব।

ভালো ছাত্র হলেও অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। রউফ এর চাচা ইপিআর এর হাবিলদার ছিলেন। একবার ছুটিতে বাড়ি এলে মুন্সি আব্দুর রউফ চাচাকে গিয়ে ধরলেন ইপিআরএ ভর্তি করে দিতে। মায়েরও এতে অমত ছিল না, কারণ সংসার তো চালাতে হবে। চাচা রউফকে নিয়ে গেলেন ভর্তি পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ১৯৬৩ সালের ৯ মে রউফ যোগ দিলেন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এ। তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৩১৮৭। চুয়াডাঙ্গার ইপিআর ক্যাম্প থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ছয় মাস পর তাঁকে কুমিল্ল­া পোস্টিং দেয়া হয়। প্রথম বেতন পেয়ে তো রউফ খুব খুশি। বেতনের সিংহভাগই পাঠিয়ে দিতেন মায়ের কাছে। ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতেন।

ইতোমধ্যে ছোট বোনটিও বিয়ের যোগ্য হয়ে গেছে। মা-কে চিঠি লিখে জানালেন তার বিয়ে ঠিক করতে। বিয়েতে নতুন শাড়ি নিয়ে আসবেন রউফ।

এর মধ্যে বাংলায় উথালপাথাল কাণ্ড ঘটতে থাকে। ৬ দফা, গণঅভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৭ মার্চ পেরিয়ে এলো ২৫ মার্চ। মুন্সি আব্দুর রউফ চট্টগ্রাম ১১ উইংএ চাকরি করতেন। সারা বাংলা তখন আন্দোলনের জোয়ারে আন্দোলিত, বাঙালি অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে মুন্সি আব্দুর রউফও সেই আন্দোলনের খবর পেতেন অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম এর কাছ থেকে।

পাকিস্তানবাহিনী তখন চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র খালাস করছিল। উদ্দেশ্য বাঙালি নিধন। বাঙালিরা তা বোঝতে পেরে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে পাকিস্তানবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং কয়েকজন শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে। সেই অস্ত্র খালাস যাতে না হতে পারে, সেই জন্য বীর বাঙালি রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। অস্ত্র খালাসের দায়িত্বে থাকা মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

ইপিআর বাহিনীকে সংগঠিত করে দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানসেনারা পৈশাচিক উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর।        পরের অংশ আগামীকাল