১৯৭১ সালে নয় মাস যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়, কেড়ে নেয় বহু মা-বোনের সম্ভ্রম। এর ফলে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয় অনেক শিশু। এ সময় কয়েকজন যুদ্ধশিশুর পাশে দাঁড়ায় মাদার তেরেসা শিশুভবন, তাদের উদ্যোগে কানাডার ১৪ দম্পতি ১৫টি যুদ্ধশিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন। যুদ্ধশিশুদের স্বাভাবিক বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে সরকার একটি অধ্যাদেশও জারি করেছিল।
কেমন আছেন সেসব যুদ্ধশিশু? ১৯৭২ সালে যাঁরা ছিলেন নিতান্তই শিশু, আজ তাঁরা পরিণত মানুষ। তাঁদের অনেকেই শেকড়ের সন্ধানে বাংলাদেশে বারবার এসেছেন, খুঁজেছেন আত্মীয়স্বজন আর জন্মদাত্রী মাকে।
কোহিনুর বেড়ে উঠেছেন নরওয়েতে তাঁর পালক মা-বাবার আশ্রয়ে। নরওয়েতে তিনি কাজ করছেন একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে। ২০১১ সালে কোহিনুর এসেছিলেন বাংলাদেশে, জানিয়েছেন নরওয়েতে তার মতো প্রায় ১০০ যুদ্ধশিশু রয়েছে।
মনোয়ারা ক্লার্ককে একাত্তরের যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কানাডার শিশুভিত্তিক একটি সংগঠন লালনপালনের জন্য নিয়ে যায়। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন সেখানে। ক্লার্কও এসেছিলেন তাঁর নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে, তাঁকে দেওয়া হয়েছে এদেশের জন্ম সনদ। মনোয়ারা ক্লার্ক দেশে এসে খুঁজে পেয়েছেন তার শতকোটি আপনজনকে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দেখেছেন এদেশের যুদ্ধকালীন হূদয়স্পর্শী নানা দৃশ্য।
রায়ান গুড ছিলেন কানাডায় যাওয়া ১৫ যুদ্ধশিশুর একজন। ১৯৮৯ সালে তাঁর পালক বাবা-মা তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে আবার তিনি বাংলাদেশে আসেন শেকড়ের টানে, নিজের গর্ভধারণী মাকে খুঁজতে। কিন্তু মাকে ফিরে না পেলেও মাতৃভূমির টান ভুলে যেতে পারেননি। ১৯৯৮ সালে আসেন এদেশে, প্রায় এক বছর অবস্থান করে জানার চেষ্টা করেন বাংলাদেশকে। যুদ্ধশিশুদের নিয়ে ২০০৩ সালে নির্মিত রেমন্ড প্রভঁশের ‘ওয়ার বেবিজ’ নামক বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রে রায়ান গুড ছিলেন প্রধান চরিত্রগুলোর একজন।
শামা হার্ট একাত্তরের আরেকজন যুদ্ধশিশু। ১৯৭২ সালে কানাডায় যে ক’টি যুদ্ধশিশুকে দত্তক নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম তিনি। তিনিও বাংলাদেশে এসেছিলেন মাতৃভূমির টানে। শামা হার্টের জন্ম ৬ মে ১৯৭২, মাদার তেরেসার একটি আশ্রমে। শামা বলেছিলেন কানাডার নাগরিক হলেও বাংলাদেশ যদি তাকে নাগরিকত্ব দিতে চায়, তবে সানন্দেই তিনি গ্রহণ করবেন। বাংলাদেশের নারীদের বর্তমান অগ্রগতি ও এগিয়ে যাওয়ার গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।